মেসির পরে কে? আর্জেন্টাইন ফুটবলের সামনে এখন এটাই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। একটি ম্যাচ, একটি রাত কিংবা একটি বিদায়ী আয়োজন দিয়ে লিওনেল মেসির অধ্যায় শেষ করা যায়; কিন্তু তাঁর জায়গায় কে দাঁড়াবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আর্জেন্টিনাকে হয়তো আরও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে।
বুধবার (০৭ অক্টোবর) বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টালে বেনিনের বিপক্ষে মেসি আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামার সাথে সাথে একটি যুগের পর্দা নেমেছে।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্র ছিলেন মেসি। শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট নয়, দলের খেলার ছন্দ, প্রতিপক্ষের ভয়, সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস– সবকিছুর সঙ্গেই মিশে ছিল তাঁর উপস্থিতি। তাই তাঁর জায়গায় একজন খেলোয়াড় বসিয়ে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। আর্জেন্টিনাকে আসলে মেসিকে ছাড়া নতুন করে নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে হবে।
অধিনায়কের আর্মব্যান্ডের প্রশ্নটির উত্তর অবশ্য অনেকটাই পরিষ্কার। মেসির পর নেতৃত্বের দায়িত্ব পাওয়ার পথে সবচেয়ে এগিয়ে ক্রিস্টিয়ান ‘কুটি’ রোমেরো। কোচ লিওনেল স্কালোনি ইতিমধ্যেই তাঁকে নেতৃত্বের পরবর্তী সারিতে রেখেছেন। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও লটারো মার্তিনেজও থাকবেন নেতৃত্বের কাঠামোয়।
কিন্তু ১০ নম্বর?
এই প্রশ্নের উত্তর আরও কঠিন। স্কালোনি জানিয়েছিলেন, মেসির বিদায়ের আগে এই জার্সি কাউকে দেওয়া হবে না। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ আর্জেন্টিনা নিজেও বুঝছে, ১০ নম্বর জার্সি নিছক একটি নম্বর নয়। সেটির সঙ্গে মিশে আছে ম্যারাডোনা, মেসি এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল–সংস্কৃতির বিশাল এক উত্তরাধিকার।
সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে হুলিয়ান আলভারেজকে। ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে মেসির অনুপস্থিতিতে নিয়মিত তার ভূমিকায় খেলেছেন আতলেতিকো মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড। ব্রাজিলের বিপক্ষে ৪–১ গোলের জয়ে গোলও করেছিলেন তিনি। তবে মেসির মতো প্লেমেকার নন আলভারেজ, আন্তর্জাতিক ফুটবলেও এখনো তার গোলসংখ্যা ৬১ ম্যাচে ১৬।
মেসির সঙ্গে খেলার ধরন সবচেয়ে বেশি মেলে নিকো পাজের। কোমোর ২২ বছর বয়সী এই বাঁ পায়ের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ১৩ ম্যাচে আর্জেন্টিনার হয়ে করেছেন ৩ গোল। মেসিও পাজের ফুটবল বুদ্ধিমত্তা ও খেলা বোঝার ক্ষমতার প্রশংসা করেছেন। তবে পাজকে মূল তারকা হিসেবে নয়, বরং আক্রমণভাগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই বেশি কার্যকর মনে করা হচ্ছে।
আরেকটি সম্ভাবনাময় নাম ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুয়োনো। ১৯ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন উইঙ্গার এরই মধ্যে জাতীয় দলের হয়ে প্রতিভার জানান দিয়েছেন। ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে খেলা, ড্রিবলিং ও দূরপাল্লার শটে তার দক্ষতার সঙ্গে মেসির মিল আছে।
মেসিকে অনুসরণ করা যায়, মেসিকে অনুকরণ করা যায়; কিন্তু মেসির জায়গা নেওয়া যায় না।
রয়টার্সের ফুটবল বিশ্লেষক সার্জিও লেভিনস্কি মেসি ও আর্জেন্টিনার সম্পর্ককে দীর্ঘদিনের ভুল বোঝাবুঝির পর হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে নতুন করে আপন করে নেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। একটা সময় যে মেসিকে দেশের মানুষ যথেষ্ট ‘আর্জেন্টাইন’ নন বলে সমালোচনা করত, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে প্রিয় ফুটবল প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
তাঁর সতীর্থদের কথাতেও সেই সম্পর্কের গভীরতা স্পষ্ট। লটারো মার্তিনেজ বিদায়ের মুহূর্তটিকে বলেছেন অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও বিশেষ একটি রাত হিসেবে। আর রোমেরোর কাছে মেসির সবচেয়ে বড় গুণ শুধু ফুটবল নয়, তিনি কখনো নিজেকে সতীর্থদের চেয়ে বড় করে দেখাননি।
সেখানেই হয়তো মেসির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
আর্জেন্টিনার সামনে তাই মেসির জায়গা পূরণ করার কাজ নেই। কাজ হলো মেসির পর একটি নতুন দল তৈরি করা। এমন একটি দল, যেখানে ১০ নম্বর জার্সি হয়তো অন্য কারও গায়ে থাকবে, আর্মব্যান্ড থাকবে অন্য হাতে, আক্রমণের দায়িত্বও ভাগ হয়ে যাবে কয়েকজনের মধ্যে, কিন্তু মেসির ছায়ায় দাঁড়িয়ে নয়, নিজেদের পরিচয়ে।
কারণ মেসির পর আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন একজন মেসি খুঁজে পাওয়া নয়; মেসি ছাড়া জিততে শেখা।