আমার কলম কিংবা কিবোর্ডের কয়েকটি বাটন দিয়ে কি লেখা সম্ভব লিওনেল মেসিকে? হয়তো না। তবুও অসাধ্যকে সাধনের চেষ্টা করছি। মেসিকে নিয়ে লেখা মানে শুধু একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ার লেখা নয়। এটা এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবলের আনন্দ, হতাশা, অপেক্ষা আর পূর্ণতার সঙ্গে মিশে আছেন। মেসিকে দেখেছি বিস্ময়বালক হিসেবে; দেখেছি ফুটবল বিশ্বের রাজা হিসেবে। আবার দেখেছি হেরে গিয়ে নীরবে ফিরে আসা এক যোদ্ধা হিসেবে।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি মেসি নামে পরিচিত হলেও, তার পুরো নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি। আজকের এই বিলিয়ন ডলারের সম্পদ, দামি গাড়ি–বাড়ি কিংবা ব্যক্তিগত জেট সবকিছু ছাপিয়ে এই মেসির গল্পটা শুরু হয়েছিল খুব সাধারণ এক পরিবারে। তার বাবা হোর্হে মেসি কাজ করতেন একটি স্টিল কারখানায়। আর তাঁর মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি পরিবারের দেখাশোনার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন। অভাব–অনটনের সেই সংসারেই বেড়ে উঠতে থাকেন ছোট্ট LM10 (এল–এম–টেন)।
ছোটবেলা থেকেই তার ফুটবল দক্ষতা ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। বল পায়ে নিলেই যেন অন্য এক মেসিকে দেখা যেত। গোল করার ক্ষুধা, ড্রিবলিং আর বলের ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ সবকিছুতেই ছিল ভবিষ্যতের এক মহাতারকার ইঙ্গিত।
৮ বছর বয়সেই আর্জেন্টিনার Newell’s Old Boys এর যুব দলে যোগ দেন মেসি। এরপর ১৩ বছর বয়সেই বার্সেলোনায় প্রথমবারের মতো ট্রায়াল দিতে যান মেসি। তার ফুটবল প্রতিভা দেখে মেসিকে নিয়ে নেয়। এরপর আসে সেই দিন ১৬ অক্টোবর ২০০৪। বয়স মাত্র ১৭ বছর। বার্সেলোনার জার্সিতে La Liga তে অভিষেক হলো এক কিশোরের। তখন হয়তো কেউ জানত না, এই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন বার্সেলোনার ইতিহাস বদলে দেবে।
এরপর শুরু হয় মেসির জয়যাত্রা। ২০০৫ সালে প্রথম La Liga গোল। ২০০৯ সালে বার্সেলোনার হয়ে Treble জয় এবং প্রথম Ballon d’Or। তারপর একের পর এক রেকর্ড, একের পর এক ট্রফি। ২০১২ সালে মাত্র এক ক্যালেন্ডার বছরে ৯১ গোল।
কিন্তু ক্লাব ফুটবলে এত সাফল্যের পরও একটা আক্ষেপ থেকেই যাচ্ছিল। আর্জেন্টিনার হয়ে লিওর নেই বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল। জার্মানির কাছে হার। ২০১৫ ও ২০১৬ দুইটি কোপা আমেরিকায় ফাইনালে উঠলেও শিরোপার স্বাদ নিতে পারিনি লিওনেল মেসি।
একসময় মনে হচ্ছিল, হয়তো মেসির গল্পে এই অপূর্ণতাই থেকে যাবে। জাতীয় দল থেকে অবসরের কথাও ভাবলেন তিনি। কিন্তু কিংবদন্তির গল্প কি এত সহজে শেষ হয়?
সালটা ২০২১, মেসির সামনে আবারও একটি ফাইনাল। ব্রাজিলের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার কোপা আমেরিকা ফাইনাল। তবে এবার আর মেসিকে শিরোপা হারা হতে হলো না। কোপা চ্যাম্পিয়ন হলো আলবিসেলেস্তারা মেসির হাতে উঠল তাঁর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। তবে গল্প তখনও শেষ হয়নি।
২০২২ সাল। কাতার বিশ্বকাপ। সেই সময়ের ৩৫ বছর বয়সী মেসি জানতেন, হয়তো এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। আর তারপর একটি মহাকাব্যের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়। ফ্রান্সের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ফাইনাল ম্যাচ।
৯০ মিনিটে সমতা। অতিরিক্ত সময়েও সমতা। তারপর পেনাল্টি শুটআউট। শেষ পেনাল্টি যখন জালে জড়াল, তখন পূর্ণতা পেয়েছিল মেসির অসমাপ্ত গল্প। শৈশবে যে ছেলেটার চিকিৎসার খরচ চালানোই পরিবারের জন্য কঠিন ছিল, সেই ছেলেটিই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন।
২০২৩ সালে ইউরোপ ছেড়ে পাড়ি জমালেন আমেরিকায়। Inter Miami ক্লাবে।
অনেকে ভেবেছিলেন, হয়তো ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু মেসি আবারও প্রমাণ করলেন বয়স শুধু একটা সংখ্যা মাত্র। নতুন দেশ, নতুন লিগ, নতুন ক্লাব সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে আবারও আলো ছড়াতে থাকলেন তিনি।
৩৯ বছর বয়সে, ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে আবারও দেখা গেল সেই চেনা মেসিকে।
বয়স যেখানে একজন ফুটবলারের সীমা হয়ে দাঁড়ায়, মেসি সেখানে বয়সকেই যেন ভুল প্রমাণ করলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে শুধু মাঠে নামেননি তিনি আর্জেন্টিনার আক্রমণের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছিলেন। একটার পর একটা ম্যাচে গোল করেছেন। তৈরি করেছেন গোলের সুযোগ।যখন দল সবচেয়ে বেশি চাপে, তখনও বলটা বারবার খুঁজে নেয় মেসির পা। ২–১ ব্যবধানে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা উঠে গেল বিশ্বকাপের ফাইনালে। আর সেই ফাইনালে ওঠার পথে মেসির অবদান? ৮ গোল। ৪ অ্যাসিস্ট। মোট ১২টি গোলে সরাসরি অবদান।
২০২৬–এর মেসি হয়তো আগের মতো প্রতিটি ম্যাচে দৌড়াতে পারেননি। কিন্তু যখনই আর্জেন্টিনার প্রয়োজন হয়েছে, ঠিক তখনই তিনি সামনে এসেছেন। কখনো গোল করে, কখনো অ্যাসিস্টে, কখনো বা একটা পাস কিংবা ক্রসে।
আর এভাবেই ৩৯ বছর বয়সে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপেও আবারও আর্জেন্টিনাকে নিয়ে গেলেন বিশ্বকাপের ফাইনালে। হয়তো ট্রফিটা এবার তাঁর হাতে ওঠেনি। কিন্তু মহাকাব্যিকের গল্পে তিনি রঙ ছড়াতে ভুল করেননি।
শত শত রেকর্ড আর ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন মেসি। ক্লাব ফুটবল থেকে শুরু করে জাতীয় দল সব জায়গায় মেসি নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। তিনি নিজেই রেকর্ড তৈরি করেন আবার তিনি নিজেই সেটিকে ভাঙেন।
২০২৬ বিশ্বকাপের পর মেসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্ট দিয়ে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। জাতীয় দল থেকে প্রিয় তারকার বিদায়ে সেদিন দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল পুরো আর্জেন্টিনা। শুধু আর্জেন্টিনা নয়, কেঁদেছিল মেসির কোটি কোটি ভক্ত। যে ১০ নম্বর জার্সিটা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি জাতির স্বপ্ন বয়ে বেড়িয়েছে, সেই জার্সিতে আর দেখা যাবে না লিওনেল মেসিকে।
তাই মেসির জন্য একটি বিদায়ী ম্যাচ আয়োজন করে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন। শেষবারের মতো প্রিয় তারকাকে আকাশী–সাদা জার্সিতে দেখতে স্টেডিয়ামে ছুটে আসেন লাখো ভক্ত। বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম সেদিন যেন পরিণত হয়েছিল আবেগের সমুদ্রে। গ্যালারিজুড়ে শুধু একটি নাম
মেসি… মেসি… মেসি…
এটা আর কোনো সাধারণ ম্যাচ ছিল না। এটা ছিল একটি যুগের বিদায়ের রাত। আর শেষবারের মতো যখন মাঠে নামলেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি, তখনও তিনি ছিলেন সেই চেনা মেসি। যে মেসিকে দেখতে পুরো পৃথিবী বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছে। বিদায়ী ম্যাচেও নিজের জাদু দেখাতে ভুললেন না তিনি। একটি গোল করলেন। আর করালেন আরও দুটি গোল। শেষ বাঁশি বাজার পর নিজের আবেগকে আর ধরে রাখতে পারলেন না লিও। চোখে পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেসি। হাজারো কণ্ঠে তখন শুধু একটাই ধ্বনি
“গ্রাসিয়াস, মেসি” ধন্যবাদ, মেসি।
একটি প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানোর জন্য। একটি দেশকে আনন্দে কাঁদানোর জন্য। আর ফুটবলকে এত সুন্দর করে তোলার জন্য।
মেসিকে নিয়ে বলা বিশ্বের সেরা এক ফুটবলারের ২টি লাইন দিয়েই হোক আজকের সমাপ্তি
মেসিকে নিয়ে কিছু বলো না, তাকে শুধু দেখে যাও, দেখার মতো করে দেখো।
মেসি তুমি অদম্য, তুমি অনন্য, তুমি জাদুকর তুমি নির্ভিক অকুতোভয় এক সাহসী যোদ্ধা।