বিয়ে শুধু দুই মানুষের সম্পর্কের বন্ধন নয়, এটি একটি সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিষ্ঠানও। তবে দাম্পত্য জীবনে মতের অমিল, কলহসহ নানা জটিলতার কারণে অনেক সময় স্বামী–স্ত্রী বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের সুযোগ রয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে।
বিশ্বের এমন দুটি দেশ রয়েছে, যেখানে সাধারণভাবে আইনগত বিবাহবিচ্ছেদের সুযোগ নেই—ফিলিপাইন ও ভ্যাটিকান সিটি। ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাষ্ট্রীয় আইনের কারণে দেশ দুটির বিবাহবিচ্ছেদ ব্যবস্থা অন্য দেশগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ভ্যাটিকান সিটি
ভ্যাটিকান সিটি বিশ্বের সবচেয়ে ছোট স্বাধীন রাষ্ট্র। এটি রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান কেন্দ্র এবং ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপের সরকারি আবাসস্থল। আয়তনে এক বর্গকিলোমিটারেরও কম এই দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাও খুবই কম।
ক্যাথলিক চার্চের ধর্মীয় নীতির প্রভাব দেশটির আইনেও রয়েছে। ফলে এখানে প্রচলিত অর্থে বিবাহবিচ্ছেদের কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ বিবাহিত দম্পতি আদালতের মাধ্যমে সাধারণ বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে আলাদা হয়ে যেতে পারেন না।
ফিলিপাইন
ফিলিপাইনও বিশ্বের অন্যতম দেশ, যেখানে সাধারণ নাগরিকদের জন্য আইনগত বিবাহবিচ্ছেদের সুযোগ নেই। দেশটির অধিকাংশ মানুষ রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি দেশটির আইনেও বিবাহকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ফিলিপাইনের সংবিধানে বিবাহকে পরিবার ও সমাজের ভিত্তি হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে বিবাহ ও পরিবারকে সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো পরিস্থিতিতেই স্বামী–স্ত্রী আলাদা হতে পারেন না। ফিলিপাইনে বিবাহ বাতিল বা ‘অ্যানালমেন্ট’ করার আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এটি বিবাহবিচ্ছেদের মতো নয়। আদালত নির্দিষ্ট কারণ ও প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো বিয়েকে বাতিল ঘোষণা করতে পারে।
যেমন—বিয়ের সময় কোনো পক্ষের আইনগত সক্ষমতার ঘাটতি থাকা, গুরুতর মানসিক অক্ষমতা বা এমন কোনো কারণ প্রমাণিত হওয়া, যার কারণে বিয়েটি বৈধভাবে সম্পন্ন হয়নি—এসব ক্ষেত্রে আদালতে বিয়ে বাতিলের আবেদন করা যায়।
অ্যানালমেন্টের প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকের জন্য এটি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আদালতের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে চার্চের নিজস্ব প্রক্রিয়াও অনুসরণ করতে হয়। ফলে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
ফিলিপাইনের আইনে স্বামী বা স্ত্রীর প্রতারণা, শারীরিক নির্যাতন কিংবা পরকীয়ার মতো গুরুতর ঘটনাও সরাসরি বিবাহবিচ্ছেদের ভিত্তি নয়। বরং নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ করে বিয়ে বাতিলের আবেদন করতে হয়। এ কারণে অনেক দম্পতিকে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
বিবাহবিচ্ছেদ বৈধ করার জন্য ফিলিপাইনে বিভিন্ন সময়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের কারণে বিষয়টি দেশটিতে অত্যন্ত বিতর্কিত। সমর্থকেরা মনে করেন, দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল অ্যানালমেন্ট প্রক্রিয়ার পরিবর্তে বৈধ বিবাহবিচ্ছেদের সুযোগ থাকা উচিত। অন্যদিকে বিরোধীরা আশঙ্কা করেন, এতে বিবাহপ্রথা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
তবে ফিলিপাইনের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। দেশটির মুসলিমদের ক্ষেত্রে পৃথক মুসলিম পারিবারিক আইন কার্যকর রয়েছে, যার অধীনে নির্দিষ্ট শর্তে বিবাহবিচ্ছেদের সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বিবাহবিচ্ছেদ একটি স্বীকৃত আইনি প্রক্রিয়া হলেও ফিলিপাইন ও ভ্যাটিকান সিটিতে বিষয়টি ব্যতিক্রম। ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রীয় আইনের সমন্বয়ে এই দুই দেশ