১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের অন্যতম যুদ্ধাহত নারী মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা গাইবান্ধা জেলার রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি আর নেই।
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্য ও নানা শারীরিক জটিলতায় শয্যাশায়ী থাকার পর বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্যাতনের শিকার হয়েও সাহস ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে জীবন কাটিয়েছেন এই সংগ্রামী নারী। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর নারী মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান ফুলমতি।
সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের ভূমি অফিসের সামনে সড়কের ধারে সরকারি খাস জমিতে পরিবার–পরিজন নিয়ে বসবাস করছিলেন তিনি। পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নির্মিত ‘বীর নিবাস’–এ বসবাস করেন ফুলমতি।
ফুলমতির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে তার ছেলে মনিরাজ কুমার।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে তার মা বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ও স্যালাইন দেওয়া হচ্ছিল। তবে ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর নিজ বাড়িতেই তার মৃত্যু হয়।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকাল ৩টায় নিজ বাড়িতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন ফুলমতি। এরপরও সাহস ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে তিনি জীবন কাটিয়েছেন।
জীবনের দীর্ঘ ৪৫ বছর অবহেলা ও বঞ্চনার পর ২০১৬ সালের মার্চ মাসে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান ফুলমতি। তবে স্বীকৃতি পেলেও তার পরিবারকে দীর্ঘদিন অর্থকষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করতে হয়েছে।
১৯৮৮ সালে ফুলমতি‘র স্বামী কুশিরাম সরকার ফসিয়া মারা যান। স্বামীকে হারানোর পর ৫ ছেলে ও ২ মেয়েকে নিয়ে একাই সংসারের ভার কাঁধে তুলে নেন ফুলমতি। পরবর্তীতে এক ছেলে ও এক মেয়ের মৃত্যু হয়।
সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে ফুলমতির আত্মত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন তিনি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অনেক চেষ্টা ও আবেদনের পর ২০১৬ সালে তাঁর স্বীকৃতি মেলে।
তিনি আরও বলেন, বার্ধক্যজনিত কারণে বীরাঙ্গনা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী ছিলেন। তার চিকিৎসার বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন এই সংগ্রামী নারী।
এসএ