৩৬ বছরে একদিনও ছুটি নেননি শিক্ষক স্বপন

Sakib Zaman Potraitসাকিব জামান
শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। এই কথার বাস্তব প্রমাণ মাগুরার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক স্বপন কুমার চক্রবর্তী।

শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। এই কথার বাস্তব প্রমাণ মাগুরার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক স্বপন কুমার চক্রবর্তী। দীর্ঘ ৩৬ বছরের কর্মজীবনে তিনি একদিনের জন্যও ছুটি নেননি। রোদ–বৃষ্টি, বাবার মৃত্যু কিংবা নিজের প্রথম সন্তানের জন্মের মতো আবেগঘন ও শোকাবহ দিনেও স্কুল কামাই দেননি এই আদর্শ শিক্ষক।

একসময় ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়ে ভর্তিও হয়েছিলেন স্বপন কুমার। কিন্তু মন সেখানে টেকেনি। শেষ পর্যন্ত শিক্ষকতাকেই ভালোবেসে বেছে নেন তিনি। ১৯৭৯ সালে মাগুরার মোহাম্মদপুর আরএসকেএইচ ইনস্টিটিউশনে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৬টি বছর। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিলিয়ে গেছেন শিক্ষার আলো।

এত দীর্ঘ সময়ে কেন একদিনও ছুটি নেননি এমন প্রশ্নের জবাবে স্বপন কুমার চক্রবর্তী বলেন, স্কুলে না গেলে আমার মনে হতো শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় একটা বড় গ্যাপ তৈরি হবে। সিলেবাস শেষ করা নিয়ে চিন্তায় থাকতাম। পাঠদানের এই দায়িত্ববোধ থেকেই কখনো ছুটির কথা ভাবিনি।

তার এই একনিষ্ঠতার নজির অভাবনীয়। বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করে পরদিন ঠিকই স্কুলে হাজির হয়েছিলেন তিনি। সনাতন ধর্মের ‘গুরুদশা‘ পালনের কঠিন নিয়মের মধ্যেও সাদা কাপড় জড়িয়ে স্কুলে গিয়ে ক্লাস নিয়েছেন। এমনকি প্রথম সন্তানের জন্মসংবাদ পেয়েও স্কুল ছুটি হওয়া পর্যন্ত ক্লাসেই অপেক্ষা করেছেন।

স্বামীর এই নিরলস পথচলায় নীরব সমর্থক ছিলেন তার স্ত্রী রেখা মুখার্জী। তিনি বলেন, ৩৬ বছরে উনি ছুটি না নেওয়ায় হয়তো আমাদের একসঙ্গে বাইরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি। এ নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ থাকলেও, উনি তো অসংখ্য ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছেন। শিক্ষাকে উজাড় করে দেওয়ার যে ইচ্ছা উনার ছিল, তা পূরণ হওয়াতেই আমার আনন্দ।

মোহাম্মদপুর আরএসকেএইচ ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক তার বিরল কর্মনিষ্ঠার প্রশংসা করে জানান, ২০০৮ সাল থেকে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি স্বপন কুমারকে একদিনের জন্যও ছুটির আবেদন করতে দেখেননি।

স্বপন কুমার চক্রবর্তীর হাতে গড়া অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ প্রতিষ্ঠিত। তার ছাত্ররা বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।

৩৬ বছরের কর্মজীবনে ছুটির খাতায় শূন্য রেখে অবসরে গেলেও, স্বপন কুমার চক্রবর্তী আজও মাগুরাবাসী এবং তার হাজারো শিক্ষার্থীর কাছে এক অনুকরণীয় বাতিঘর।

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More