মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বহু চিরন্তন সত্য, সুস্পষ্ট নিদর্শন ও চিরাচরিত নীতি বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, মন্দ ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্রকারীর ওপর ফিরে আসে এবং তার পরিণতি তাকেই ভোগ করতে হয়—শুধু সময়ের অপেক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পৃথিবীতে অহংকার করা এবং মন্দ ষড়যন্ত্র করার কারণে (কাফিরদের বিমুখতা বৃদ্ধি পেয়েছে)। অথচ মন্দ ষড়যন্ত্র তার কর্তার ওপরই আপতিত হয়….।’ (সুরা ফাতির, আয়াত : ৪৩)
‘মকর’ (মকর/ষড়যন্ত্র) অর্থ হলো প্রতারণা বা এমন গোপন কৌশল অবলম্বন করা, যার মাধ্যমে কোনো প্রতিপক্ষ বা শত্রুকে ক্ষতির মধ্যে ফেলা হয়।
যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে ষড়যন্ত্র করে, সে ষড়যন্ত্রের পরিণতি ভোগ করার উপযুক্ত হয়ে যায়।
আলোচ্য আয়াতের শিক্ষা হলো, যে ব্যক্তি অন্যের জন্য অমঙ্গল কামনা করে, তার সেই অমঙ্গল নিজের দিকেও ফিরে আসতে পারে। সাধারণ মানুষও বলে থাকে—‘যে অন্যের জন্য গর্ত খোঁড়ে, সে নিজেই তাতে পড়ে।’
কর্মের পরিণতি অবশ্যম্ভাবী
যে ব্যক্তি কোনো কারণ সৃষ্টি করে, সে সেই কারণের ফলাফলের অপেক্ষায় থাকে—সে তা উপলব্ধি করুক বা না করুক। তাই কোনো মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন বলা যায় যে সে শাস্তির কারণ সৃষ্টি করেছে এবং সে সেই শাস্তির সম্ভাব্য পরিণতির সম্মুখীন।
এই আয়াতের আরেকটি শিক্ষা হলো, বান্দাদের ব্যাপারে আল্লাহর বিধান এক ও অভিন্ন।
যে আল্লাহর আনুগত্য করে, তিনি তাকে পুরস্কৃত করেন; আর যে অবাধ্য হয়, সে তার অবাধ্যতার পরিণতি ভোগ করে। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবে না এবং আল্লাহর বিধানে কোনো রূপান্তরও পাবে না।’
এই আয়াত থেকে আরো জানা যায় যে আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও প্রজ্ঞা পরিপূর্ণ। কারণ, পূর্ববর্তী লোকদের ওপর যে শাস্তি এসেছিল, তার পেছনে নির্দিষ্ট কারণ ছিল। পরবর্তীদের মধ্যেও যদি সেই কারণ উপস্থিত হয়, তাহলে সেই কারণ তার পরিণতি ডেকে আনবে—এটাই হেকমত বা প্রজ্ঞার দাবি।
মুমিনের জন্য আশার বার্তা
এই ঈমানি সত্য আমাদের অন্তরে আল্লাহর প্রতি গভীর আশা ও আস্থা সৃষ্টি করে। কারণ সব বিষয়ের কর্তৃত্ব তাঁর হাতেই। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেন, প্রিয় বান্দাদের সমর্থন করেন এবং শত্রুদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেন। আল্লাহ বলেন, ‘বরং যারা কুফরি করেছে, তাদের কাছে তাদের ষড়যন্ত্রকে আকর্ষণীয় করে দেখানো হয়েছে এবং তাদেরকে (সত্য) পথ থেকে বিরত রাখা হয়েছে। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার কোনো পথপ্রদর্শক নেই।’ (সুরা রাদ, আয়াত : ৩৩)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তারা ষড়যন্ত্র করেছিল এবং আল্লাহও তাদের পরিকল্পনা প্রতিহত করেছিলেন। আর আল্লাহ সর্বোত্তম কৌশলকারী।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ৩০)
সালেহ (আ.)-এর জাতির ঘটনা
আল্লাহর নবী সালেহ (আ.)-এর বিরুদ্ধে কিছু লোক গোপনে ষড়যন্ত্র করেছিল। তারা তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল। আল্লাহ বলেন, ‘নগরে ছিল ৯ জন ব্যক্তি, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং সংশোধন করত না। তারা বলল, ‘তোমরা আল্লাহর নামে শপথ করে বলো, আমরা অবশ্যই রাতে তাকে ও তার পরিবারকে হত্যা করব; তারপর তার অভিভাবককে বলব, তার পরিবার হত্যার সময় আমরা সেখানে উপস্থিত ছিলাম না; আর আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।’
তারা এক ষড়যন্ত্র করেছিল এবং আমিও এক কৌশল করেছিলাম, অথচ তারা তা উপলব্ধি করতে পারেনি।
অতএব দেখো, তাদের ষড়যন্ত্রের পরিণতি কী হয়েছিল! আমি তাদের ও তাদের জাতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিলাম। তাদের ঘরগুলো তাদের জুলুমের কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় পড়ে রইল।’ (সুরা আন–নামল, আয়াত : ৪৮–৫২)
ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা
ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল এবং তাঁকে কূপে ফেলে দিয়েছিল। তাঁর প্রতি তারা অন্যায় আচরণ করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ষড়যন্ত্রের ফল কী হলো?
আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কে সম্মানিত করলেন এবং পৃথিবীতে তাঁর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করলেন। আল্লাহ বলেন, ‘এভাবেই আমি ইউসুফকে দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম; তিনি সেখানে যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করতে পারতেন। আমি আমার রহমত যাকে ইচ্ছা দান করি এবং সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করি না।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৫৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র
মুশরিকরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাঁকে হত্যা করার জন্য তারা তাঁর বাড়ির চারপাশে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাঁর নবীকে হিজরতের নির্দেশ দিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বের হয়ে গেলেন এবং তাঁর স্থানে আলী (রা.) তাঁর বিছানায় শুয়ে থাকলেন।
মুশরিকরা ভেবেছিল, রাসুলুল্লাহ (সা.) এখনও ঘরের ভেতরে আছেন। কিন্তু তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হলো।
আল্লাহ বলেন, ‘আর স্মরণ করো, যখন কাফিররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল—তোমাকে বন্দী করার জন্য, হত্যা করার জন্য অথবা তোমাকে বের করে দেওয়ার জন্য। তারা ষড়যন্ত্র করছিল এবং আল্লাহও পরিকল্পনা করছিলেন; আর আল্লাহ সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ৩০)
ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের বিরুদ্ধেই যায়
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিরুদ্ধে তাঁর শত্রুরা বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘এভাবেই প্রত্যেক জনপদে আমি তার অপরাধীদের বড় বড় লোকদের রেখেছি, যাতে তারা সেখানে ষড়যন্ত্র করে। অথচ তারা নিজেদের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র করে, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।’ (সুরা আল–আনআম, আয়াত : ১২৩)
তাই মুমিনদের উচিত শত্রুদের ষড়যন্ত্রের শক্তি দেখে হতাশ না হওয়া। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং বিশ্বাস করা যে অন্যায় ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্রকারীর জন্যই ক্ষতির কারণ হতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের পূর্ববর্তীরাও ষড়যন্ত্র করেছিল; অতঃপর আল্লাহ তাদের ভবনের ভিত্তিমূলে আঘাত করেছিলেন এবং তাদের ওপর ছাদ ধসে পড়েছিল; আর এমন স্থান থেকে তাদের কাছে শাস্তি এসেছিল, যেখান থেকে তারা ধারণাও করেনি।’ (সুরা আন–নাহল, আয়াত : ২৬)
পরকালে ষড়যন্ত্রকারীদের পরিণতি
দুনিয়াতে কখনো কখনো অন্যায়কারীদের ষড়যন্ত্র সফল হয়েছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তারা আল্লাহর বিচার থেকে রক্ষা পেয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা মন্দ কাজের ষড়যন্ত্র করে, তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। আর তাদের ষড়যন্ত্রই ব্যর্থ হবে।’ (সুরা ফাতির, আয়াত : ১০)
মুহাম্মদ ইবনে কাব আল–কুরাজি (রহ.) বলেন, তিনটি বিষয় এমন আছে—যদি তুমি পারো, জীবনে কখনো এগুলোর কোনোটি পরিত্যাগ করো না—
১. কারো ওপর জুলুম করো না। কারণ আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের বিদ্রোহ তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধেই।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ২৩)
২. কারো বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো না। কারণ, আল্লাহ বলেন, ‘মন্দ ষড়যন্ত্র তার কর্তার ওপরই আপতিত হয়।’ (সুরা ফাতির, আয়াত : ৪৩)
৩. কখনো অঙ্গীকার ভঙ্গ করো না। কারণ, আল্লাহ বলেন, ‘যে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, সে নিজের বিরুদ্ধেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে।’ (সুরা আল–ফাতহ, আয়াত : ১০)
ইমাম বুখারি (রহ.)-এর একটি ঘটনা
ইমাম বুখারি (রহ.)-কে যখন বলা হলো, ‘কিছু মানুষ আপনার বিরুদ্ধে কথা বলে’, তখন তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তানের ষড়যন্ত্র দুর্বল।’
এরপর তিনি এই আয়াতও পাঠ করলেন, ‘মন্দ ষড়যন্ত্র তার কর্তার ওপরই আপতিত হয়।’ (সুরা ফাতির, আয়াত : ৪৩)
সারকথা হলো, অন্যায়, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্র থেকে নিজেকে বাঁচানো এবং আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা। হতাশ হওয়া উচিত নয়। কারণ, আল্লাহর বিচার ও বিধান চূড়ান্ত, আর প্রত্যেক মানুষ তার কাজের পরিণতির মুখোমুখি হবে।