মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়, বিশ্বজুড়ে এক কণ্ঠে ‘ধন্যবাদ লিও’

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

দীর্ঘ দুই দশকের পথচলা। অসংখ্য সাফল্য–ব্যর্থতা, কান্না–হাসি, ভাঙা–গড়ার গল্প পেরিয়ে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে লিওনেল মেসির অধ্যায় যেন পৌঁছে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। ফুটবলপ্রেমীরা জানতেন, একদিন না একদিন এই কিংবদন্তিকে বিদায় বলতে হবে। কিন্তু সেই দিনটি যখন সত্যিই সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন ফুটবল বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে নেমে আসে এক অদৃশ্য বিষণ্নতা।

মেসির গল্প শুধু গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফির গল্প নয়। এটি একজন মানুষের অবিশ্বাস্য অধ্যবসায়, ব্যর্থতার পর বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। একই সঙ্গে এটি এমন এক দেশের গল্প, যারা দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিজেদের প্রিয় তারকার হাত ধরে ফিরে পেয়েছিল বিশ্বজয়ের স্বাদ।

রোসারিওর ছোট্ট ছেলেটি থেকে বিশ্বজয়ের নায়ক

১৯৮৭ সালে আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে জন্ম লিওনেল মেসির। ছোটবেলায় তার শারীরিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যা ধরা পড়ে। এরপর বার্সেলোনার সহায়তায় মাত্র ১৩ বছর বয়সে স্পেনে পাড়ি জমান তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে ওঠার যাত্রা।

স্পেনে বেড়ে ওঠা এবং ইউরোপের ফুটবলে একের পর এক সাফল্য পেলেও মেসির হৃদয়ে ছিল নিজের দেশ আর্জেন্টিনা। নীল–সাদা জার্সি পরার স্বপ্ন থেকেই জাতীয় দলে পথচলা শুরু।

তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির শুরুটা ছিল মোটেই স্বপ্নের মতো নয়। ২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। এরপর ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ ও ২০১৮—একাধিক বিশ্বকাপেও পূরণ হয়নি শিরোপার স্বপ্ন।

সবচেয়ে বড় হতাশা এসেছিল ২০১৪ সালে। ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে ট্রফির একেবারে কাছ থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল মেসিদের। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে টানা পরাজয়। একপর্যায়ে অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি।

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান

কিন্তু মেসির গল্প তখনো শেষ হয়নি। ভক্তদের ভালোবাসা, সতীর্থদের আকুতি এবং দেশের প্রতি টান তাকে আবার ফিরিয়ে আনে আর্জেন্টিনার জার্সিতে। এরপর শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।

২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় ছিল সেই অধ্যায়ের প্রথম বড় সাফল্য। ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের হারিয়ে ২৮ বছরের বড় শিরোপাখরা কাটায় আর্জেন্টিনা। মেসিও জিতে নেন জাতীয় দলের হয়ে নিজের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা।

এরপর ২০২২ সালে ফিনালিসিমা জয়। আর সেই বছরের শেষেই আসে কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ।

কাতারের মাটিতে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই মহাকাব্যিক ফাইনাল। অতিরিক্ত সময়, একের পর এক গোল, টাইব্রেকারের রোমাঞ্চ—সবশেষে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে মেসি। যে ট্রফির জন্য এত বছর অপেক্ষা, এত ব্যর্থতা, এত সমালোচনা—শেষ পর্যন্ত সেটিই উঠল তার হাতে।

সেই মুহূর্তে যেন পূর্ণতা পেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফাইনাল শেষে বিশ্বজয়ের মুকুট পরলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

কেন বারবার উঠছে অবসরের আলোচনা?

বিশ্বকাপ জয়ের পরও মেসির আন্তর্জাতিক অধ্যায় থেমে থাকেনি। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকা জিতে আর্জেন্টিনা। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অবসরের আলোচনা আরও জোরালো হতে থাকে।

মেসি এখন ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে। দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার শারীরিক চাপও কম নয়। নিজেও বিভিন্ন সময়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন, শরীর ও মানসিক প্রস্তুতিই তার ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় বিষয় হবে।

তাই আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচেই এখন মেসিকে ঘিরে তৈরি হয় বাড়তি আবেগ। মাঠে তার উপস্থিতি, সতীর্থদের সঙ্গে মুহূর্ত, দর্শকদের ভালোবাসা—সবকিছুতেই যেন লুকিয়ে থাকে বিদায়ের সম্ভাব্য সুর।

পরিসংখ্যানে মেসির মহাকাব্য

আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির পরিসংখ্যানই বলে দেয় তার শ্রেষ্ঠত্বের গল্প। ১৮০টির বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নিয়ে তিনি করেছেন শতাধিক গোল—যা আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

জাতীয় দলে তার বড় অর্জনের তালিকা:
ফিফা বিশ্বকাপ (২০২২ সাল)

কোপা আমেরিকা (২০২১ ও ২০২৪ সাল)

ফিনালিসিমা (২০২২ সাল)

অলিম্পিক স্বর্ণপদক (২০০৮ সাল)

তবে এসব সংখ্যার বাইরেও মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন—তিনি একটি পুরো জাতিকে আবারও স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন।

মেসিকে ঘিরে আবেগে ফুটবল বিশ্ব

বুয়েনস আইরেস থেকে ঢাকা—বিশ্বের অসংখ্য শহরে ছড়িয়ে আছে মেসির কোটি কোটি ভক্ত। তার বিদায়ের সম্ভাবনা তাই কেবল আর্জেন্টিনার সমর্থকদের নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বের আবেগের বিষয়।

একদিকে বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসির ক্যারিয়ারের পূর্ণতা পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে নীল–সাদা জার্সিতে আর কখনো তাকে মাঠে না দেখার আশঙ্কা—দুই অনুভূতিই পাশাপাশি হাঁটছে।

আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও বহুবার বলেছেন, মেসি যতদিন খেলতে চাইবেন, জাতীয় দলে তার জায়গা থাকবে। কিন্তু ফুটবলের নিয়মই এমন—একদিন কিংবদন্তিদেরও মাঠ ছাড়তে হয়।

শেষ নয়, এক অমর গল্পের শুরু

ফুটবলে অনেক কিংবদন্তি এসেছেন, আবার সময়ের স্রোতে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার নীল–সাদা জার্সিতে লিওনেল মেসি যে গল্প লিখেছেন, তা কোনো গোল, ট্রফি কিংবা রেকর্ড দিয়ে পুরোপুরি মাপা সম্ভব নয়।

তিনি শিখিয়েছেন—ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়। বারবার পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়ানো যায়। সমালোচনার জবাব দেওয়া যায় মাঠে। আর দীর্ঘ অপেক্ষার পরও স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।

রোসারিওর ছোট্ট সেই ছেলেটি একদিন হয়ে উঠেছিলেন পুরো আর্জেন্টিনার স্বপ্নের প্রতীক। বিশ্বকাপ হাতে সেই স্বপ্ন পূরণও করেছেন।

হয়তো আর্জেন্টিনার নীল–সাদা জার্সিতে মেসির মহাকাব্য এখন শেষ অধ্যায়ের দিকে। কিন্তু তার গল্পের শেষ নেই। কারণ মেসি শুধু ফুটবল খেলেননি—তিনি একটি প্রজন্মকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন ফুটবলকে, শিখিয়েছেন স্বপ্ন দেখতে।

মাঠ থেকে একদিন তিনি বিদায় নেবেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিতে লিওনেল মেসির নামটি থেকে যাবে চিরকাল—ফুটবল ইতিহাসের সোনালি পাতায়, আর কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে।

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More