বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন পরিচ্ছন্ন, প্রজ্ঞাবান ও সজ্জন রাজনীতিক হিসেবে সমধিক পরিচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বর্তমানে তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা ও কলেজ শিক্ষক থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ মঞ্চে তার উঠে আসার এই পথচলা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও ঘটনাবহুল।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালে উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অধ্যয়নকালে তিনি বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকানোর পর তিনি সরাসরি জাতীয় রাজনীতিতে না জড়িয়ে পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন।
বিসিএস (নিরীক্ষা ও হিসাব) ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি শিক্ষকতাকেই আদর্শ পেশা হিসেবে বেছে নেন। তিনি ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগ দিয়ে জেলা বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তার জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অধ্যায় শুরু হয়।
জাতীয় রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলের মূল উত্থান ঘটে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এবং দুই হাজার দশকের শুরুতে। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ওই সরকারে তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। একজন পরিচ্ছন্ন ইমেজের মন্ত্রী হিসেবে সে সময় তিনি বেশ প্রশংসা কুড়ান।
২০১১ সালে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। দলের চরম সংকটময় মুহূর্তে তিনি শক্ত হাতে বিএনপির হাল ধরেন। বিগত সরকারগুলোর আমলে বিরোধী দল হিসেবে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে এবং অসংখ্য রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
তীব্র রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, জেল-জুলুম এবং শত শত মামলার চাপ মোকাবিলা করেও তিনি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন। তার পরিমিতিবোধ, প্রজ্ঞাপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কারণে নিজ দলের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি এক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।