বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম একটি বহুল আলোচিত নাম। রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং পরবর্তীতে নিজের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) শীর্ষ নেতা হিসেবে তার দীর্ঘ কর্মজীবন যেমন অর্জনে ভরপুর, তেমনি নানা রাজনৈতিক বাঁকবদলের কারণে তা বিতর্কিতও।
১৯৩৯ সালের ১৩ মার্চ চট্টগ্রামের চন্দনাইশে জন্মগ্রহণ করেন অলি আহমেদ। তিনি আইন বিষয়ে পড়ার পাশাপাশি কাকুলে অবস্থিত পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দেন এবং ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর পেয়ে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত এই তরুণ অফিসার দেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রথম সারির সামরিক বিদ্রোহে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে সামরিক জীবনের ইতি টানেন অলি আহমেদ। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অলি আহমেদ সেনাবাহিনীতে চাকরির মেয়াদ ৯ বছর বাকি থাকতেই পদত্যাগ করে রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং পরবর্তীতে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গঠন করলে তাকে যোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার আমলেই দেশের অন্যতম মেগা-প্রকল্প যমুনা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল এবং রেলওয়ে ও সড়ক যোগাযোগে নানা সংস্কার আনা হয়।
তবে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শীর্ষে ওঠার পাশাপাশি অলি আহমেদের বিরুদ্ধে নানা সময়ে বিভিন্ন বিতর্ক ও উচ্চাভিলাষের অভিযোগও উঠেছে। প্রথম মেয়াদে যোগাযোগ মন্ত্রী থাকাকালে তার অত্যন্ত সংবেদনশীল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দলটির ভেতরে বিভেদ তৈরি করেছিল এবং তৎকালীন সময়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমকে সেনাপ্রধান করার ক্ষেত্রেও তার জোর খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। একসময় তাকে ভারতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি ভারতের কঠোর সমালোচকে পরিণত হন।
দীর্ঘকাল বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার পর দলের নেতৃত্বের সঙ্গে তার চূড়ান্ত মতবিরোধ দেখা দেয়। বিএনপি সরকারের শেষদিকে এসে তিনি দুর্নীতি ও দুঃশাসনের অভিযোগ তুলে দল থেকে পদত্যাগ করেন। ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে মিলে নতুন দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠন করেন। পরবর্তীতে বদরুদ্দোজা চৌধুরী দল থেকে আলাদা হয়ে গেলেও অলি আহমেদ দলটির নেতৃত্ব ধরে রেখেছেন।