সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১০ম গ্রেডে উন্নীত (গেজেটেড কর্মকর্তা) করার পর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো তার সুফল পাচ্ছেন না শিক্ষকেরা। বেতন নির্ধারণের (ফিক্সেশন) কাজ শুরু না হওয়ায় তাঁদের আগের গ্রেড অনুযায়ীই বেতন নিতে হচ্ছে। এদিকে সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ১৩ থেকে ১১তমে উন্নীত করার প্রস্তাবও বর্তমানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে।
ফিক্সেশন না হওয়ায় সীমাহীন বৈষম্যের আশঙ্কা
আদালতের রায়ের পর গত ডিসেম্বরে প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১০ম গ্রেডে উন্নীত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন এই ১০ম গ্রেডে প্রধান শিক্ষকদের মূল বেতন শুরু হবে ১৬ হাজার টাকা দিয়ে, যার সর্বোচ্চ ধাপ ৩৮ হাজার ৬৪০ টাকা। এর আগে তাঁদের গ্রেড ছিল ১১ ও ১২তম (মূল বেতন যথাক্রমে ১২,৫০০ ও ১১,৩০০ টাকা)।
প্রধান শিক্ষকদের অভিযোগ— প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসের দীর্ঘসূত্রতার কারণেই বেতন নির্ধারণ আটকে আছে। আগামী ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে ফিক্সেশন শুরু না হলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে সর্বাত্মক অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন বলে আলটিমেটাম দিয়েছেন শিক্ষকেরা।
বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির নীতিনির্ধারণী কমিটির চেয়ারম্যান মো:, আলাউদ্দিন মোল্লা ও নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে বেতন নির্ধারণের পর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে শিক্ষকেরা আর্থিক ক্ষতি ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এমনকি ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া নবম পে–স্কেলের বেতন নির্ধারণের আগে এই ১০ম গ্রেডের ফিক্সেশন করা না হলে প্রধান শিক্ষকেরা সীমাহীন বেতনবৈষম্যের শিকার হবেন।“
এর আগে ২০১৪ সালে এক গেজেটের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তার পদমর্যাদা দেওয়া হলেও গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছিল ১১ ও ১২তম। পরে ১০ম গ্রেড ও গেজেটেড কর্মকর্তার মর্যাদার দাবিতে ৪৫ জন প্রধান শিক্ষক উচ্চ আদালতে রিট করেন।
২০২৫ সালের মার্চে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালত চূড়ান্ত রায় দেন। রায়ের পর গত বছরের অক্টোবরে প্রথমে রিটকারী ৪৫ জনের এবং পরবর্তীতে ডিসেম্বরে সারা দেশের সব প্রধান শিক্ষকের বেতন ১০ম গ্রেডে উন্নীত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারির পর অর্ধেক বছর পার হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন জানান, বিষয়টি নিয়ে চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসারের সঙ্গে আজ রবিবারই বৈঠকে বসবেন তাঁরা। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আটকে আছে সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড পরিবর্তনের প্রস্তাবও
বর্তমানে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা ১৩তম গ্রেডে (মূল বেতন ১১,০০০ টাকা) কর্মরত আছেন। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাঁদের দাবির মুখে বেতন গ্রেড ১১তম করার প্রস্তাব জাতীয় বেতন কমিশনে পাঠানো হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত কমিশনের কার্যপরিধির মধ্যে না থাকায় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
পরবর্তীতে সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে উন্নীত করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং অর্থ বিভাগেও প্রস্তাব পাঠায় মন্ত্রণালয়। এটি বাস্তবায়ন হলে সরকারের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৮৩১ কোটি ৯১ লাখ টাকা খরচ হবে। তবে এই প্রস্তাবটিও এখন পর্যন্ত ঝুলে রয়েছে।
বর্তমানে দেশে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌনে চার লাখের বেশি শিক্ষক রয়েছেন, যার মধ্যে সহকারী শিক্ষকই সাড়ে তিন লাখের বেশি। এছাড়া আরও ১৪ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষকের নিয়োগ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
কাটল জটিলতা: ৩৬,২৩৫ প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি শুরু
দীর্ঘদিন আইনি জটিলতার কারণে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ থাকলেও গত বৃহস্পতিবার উচ্চ আদালতের রায়ের পর সেই জটিলতা কেটে গেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শূন্য থাকা ৩৬ হাজার ২৩াসটি প্রধান শিক্ষক পদে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু করা হয়েছে।