আষাঢ়ের শেষভাগে এসে ভারতের ত্রিপুরা থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বর্ষণে ফেনীর পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার লাখো মানুষের বুকে যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তা কিছুটা কাটতে শুরু করেছে। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর পানি ক্রমান্বয়ে কমতে থাকায় নদীপাড়ের বাসিন্দাদের মাঝে স্বস্তি ফিরছে। তবে পুরোপুরি কাটেনি বেড়িবাঁধ ভাঙনের শঙ্কা।
জেলা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, আজ শনিবার (১১ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় জেলায় মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
বৃষ্টিপাতের বেগ কিছুটা কমলেও জেলা আবহাওয়া কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই মৃদু বৃষ্টিপাত আরও দুই–একদিন স্থায়ী হতে পারে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, আজ সকাল ১০টায় পরশুরাম পয়েন্টে মুহুরী নদীর পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৩৫ মিটার। অথচ মাত্র আট ঘণ্টা আগে, অর্থাৎ শুক্রবার দিবাগত রাত ১টায় এই উচ্চতা ছিল ১০ দশমিক ৯৯ মিটার।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, এখানকার বিপদসীমা ১২ দশমিক ৫৫ মিটার। ফলে বর্তমানে পানি বিপদসীমার বেশ নিচ দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে এবং ক্রমান্বয়ে তা আরও নামছে।
ফুলগাজীর বাসিন্দা সাহেদ হোসেন বলেন, ভয় লাগে গভীর রাত নিয়ে। কখন যে বাঁধ ভেঙে ঘরের ভেতর পানি চলে আসে, সেই আতঙ্কে গত কয়েকদিন চোখের পাতা এক করতে পারছি না। আজ পানি কিছুটা কমায় স্বস্তি অনুভব করছি।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে এই তিন নদীর দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে মুহূর্তের মধ্যে লোকালয় প্লাবিত হয়। ঢলের পানিতে ভেসে যায় গোয়ালের গবাদিপশু, কৃষকের বুকভরা আশার আমনের বীজতলা আর মৎস্য চাষীদের স্বপ্নের ঘের। ফলে পানি কমলেও বাঁধের দুর্বল পয়েন্টগুলো নিয়ে এখনো পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত হতে পারছেন না স্থানীয়রা।
সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি ঠেকাতে ও জানমাল রক্ষায় মাঠে নেমেছে স্থানীয় প্রশাসন। গত মঙ্গলবার বিকেলে ফেনী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পরিস্থিতি সম্পর্কে ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ত্রিপুরায় ভারী বর্ষণের কারণে আমাদের নদীগুলোর পানি বাড়ছিল। আমরা সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ আগাম প্রস্তুতি নিয়েছি। সরকারি কর্মকর্তা, মেডিকেল টিম ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। একই সাথে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিষ্কার করা ও শুকনো খাবার মজুত রাখার প্রক্রিয়া চলছে।
অন্যদিকে, ফেনী পাউবো–এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তারা সার্বক্ষণিকভাবে নদীর বাঁধ ও পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে জরুরি মেরামতের জন্য বালির বস্তা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখছেন।
আপাতত প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ কিছুটা শান্ত হওয়ায় ফেনীর উত্তরাঞ্চলের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। মেঘ কেটে গিয়ে মুহুরী–কহুয়া–সিলোনীয়া চিরতরে শান্ত হোক–এখন এটাই নদীপাড়ের লাখো মানুষের একমাত্র প্রার্থনা।
আবদুল্লাহ আল–মামুন/এজে/দীপ্ত সংবাদ