পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘ দেড় দশকের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটেছে। আনন্দবাজার পত্রিকার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পরাজয়ের নেপথ্যে মূলত সাতটি প্রধান কারণ কাজ করেছে।
অর্থনীতির বেহাল দশা ও শিল্পের আকাল:
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানের মূলে ছিল সিঙ্গুর–নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন, কিন্তু সেই আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত বাংলার অর্থনীতির জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্প বনাম জমি—এই সংঘাতের কোনো সমাধান না করে যেকোনো রকম জমি অধিগ্রহণ নিয়ে তার সরকার বিরূপ অবস্থান নেয়। অর্থনীতিবিদ সুরজিত ভাল্লা দেখিয়েছেন যে, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রাজ্যে মাথাপিছু আয় হ্রাসের হার বার্ষিক ১ শতাংশে ঠেকেছে। এমনকি অর্থনীতিবিদ মৈত্রীশ ঘটক, তনিকা চক্রবর্তী ও দীলিপ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জাতীয় হারের (৩%) তুলনায় রাজ্যে শহুরে দারিদ্র্যের হার (৭%) অনেক বেশি ছিল, কারণ সেখানে শিল্প–সংক্রান্ত কর্মসংস্থান নেই। এক সাবেক আমলা জানান, জার্মান রাষ্ট্রদূত রাজ্যে বিনিয়োগের আগ্রহ নিয়ে একটি ‘প্রেজেন্টেশন’ দিতে চাইলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাতে ভ্রুক্ষেপ না করে রাজনৈতিক বিরোধী ও সাংবাদিকদের নিন্দা করতেই সময় ব্যয় করেছিলেন।
ধর্মীয় রাজনীতির ভুল সমীকরণ:
মুসলিমদের আস্থা অর্জনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উন্নয়নমূলক কাজের চেয়ে ধর্মীয় ভাবাবেগ ও ধর্মগুরুদের তোষণের সহজ পথ বেছে নিয়েছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাথায় হিজাব টানা বা মৌলানা–মৌলবিদের নিয়ে রাজনীতির মঞ্চ সাজিয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দৈত্যকে তিনিই বোতল খুলে বের করে দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাদ মাহমুদ মনে করেন, ইহুদিদের কাছে ইজরায়েল যেমন, হিন্দুত্ববাদীদের কাছে পশ্চিমবঙ্গ তেমনই গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমি। মমতার এই দ্বিমুখী ধর্মীয় রাজনীতি শেষ পর্যন্ত হিন্দু ভোটের প্রবল মেরুকরণ নিশ্চিত করেছে, যার সুবিধা নিয়েছে বিজেপি।
‘ভুতুড়ে‘ ভোটার ও রিগিং নিয়ন্ত্রণ:
নির্বাচন কমিশনের কড়াকড়ি এবং এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় প্রায় ৬৪ লক্ষ ভুয়া বা ‘ভুতুড়ে‘ ভোটার বাদ পড়া তৃণমূলের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান যান্ত্রিক কারণ। মৃত বা স্থানান্তরিত প্রায় ১০–১৫ লক্ষ ভুতুড়ে ভোটার হারিয়ে তৃণমূল বড় ধাক্কা খেয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বজ্র আঁটুনিতে এবার বুথ দখল বা ভয় দেখিয়ে বিরোধী ভোটারদের আটকে রাখা সম্ভব হয়নি, যা সাধারণ ভোটারদের সাহস জুগিয়েছে।
দুর্নীতি, কাটমানি ও সিন্ডিকেট:
শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি এবং প্রভাবশালী নেতাদের বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হওয়া সরকারের ভাবমূর্তি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। কংগ্রেস নেতা ও অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিৎ বসু দেখিয়েছেন, ২০১১–১২ অর্থবর্ষে জাতীয় জিডিপিতে রাজ্যের অবদান ৬ শতাংশ থাকলেও ২০২৩–২৪ সালে তা ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। শিল্প বিশেষজ্ঞরা স্বরূপ বিশ্বাসের মতো নেতাদের ইউনিয়নবাজি ও সরকারি মদতে চলা তোলাবাজিকে বিনিয়োগকারীদের প্রধান উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সামান্য ঘরবাড়ি তৈরির কাজেও তৃণমূল নেতাদের ‘কাটমানি’ দেওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল।
আই–প্যাক নির্ভরতা ও সংগঠনের ভাঙন:
দলীয় সংগঠনকে চাঙ্গা করার পরিবর্তে পরামর্শদাতা সংস্থা আই–প্যাকের ওপর অতি–নির্ভরশীলতা তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের কার্যত ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ বানিয়ে দিয়েছিল। অনেক নেতার মতে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আই–প্যাককে নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কাজে ব্যবহার করেছেন। নির্বাচনের ঠিক আগে কেন্দ্রীয় এজেন্সি আই–প্যাক কর্তা বিনেশ চান্দেলকে গ্রেপ্তার করায় পুরো নির্বাচনী ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে, কারণ স্থানীয় নেতাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা লোপ পেয়েছিল।
দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক হিংসা:
‘বদলা নয়, বদল চাই’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এলেও বাস্তবে বিরোধীদের ওপর ক্রমাগত হামলা ও মামলা অব্যাহত ছিল। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে হিংসা ও ভোট লুটের চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি মানুষের মনে স্থায়ী ক্ষোভের সৃষ্টি করে। তৃণমূল আর রাজনৈতিক হিংসা নামিয়ে আনার জায়গায় নেই বুঝতে পেরে অনেক বিরোধী ভোটার, যাঁরা দীর্ঘ দিন ভোট দিতে পারতেন না, তাঁরা এবার দলে দলে বেরিয়ে আসেন। এই নির্ভয় ভোটদানের ফলে ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় বিজেপি এবার তাদের ভোট প্রায় ৬০ লক্ষ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
আস্থার চূড়ান্ত সংকট ও ‘অভয়া‘ কাণ্ড:
আরজি কর হাসপাতালের ঘটনা বা ‘অভয়া কাণ্ড‘ সামলাতে সরকারের রহস্যময় ভূমিকা সাধারণ মানুষের মনে চরম আস্থার সংকট তৈরি করে। মানুষ একবার কোনো কিছু বিশ্বাস করে নিলে তা বদলানো কঠিন, আর পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেই আস্থাই হারিয়েছে। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মনে হয়েছে যে, সরকারের শোধরানোর ইচ্ছাও নেই, এলেমও নেই। এমনকি অ্যাপলের টিম কুকের মতো বড় বিনিয়োগকারীদের আনার যোগ্যতাও এই সরকারের নেই বলে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল।