শনিবার, ১৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক মসজিদেই ৫০ বছর ইমামতি: প্রিয় ইমামকে রাজকীয় বিদায়

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে পরম নিষ্ঠার সাথে নামাজে ইমামতি, খুতবা, দ্বীনি শিক্ষা ও সামাজিক নেতৃত্ব দিয়ে যিনি হয়ে উঠেছিলেন এলাকার মানুষের ছায়াতুল্য অভিভাবকতিনি মাওলানা শামসুল হক মিয়াজী (৯৫)। অবশেষে বয়সের ভারে স্বেচ্ছায় অবসর নিলেন এই প্রবীণ আলেম। আর বিদায়ের এই ক্ষণটিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে প্রিয় ইমামকে ফুলসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে করে রাজকীয় সম্মানে বাড়ি পৌঁছে দিল এলাকাবাসী। অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রিয় অভিভাবককে বিদায় জানানোর এই আবেগঘন দৃশ্যটি দেখা গেছে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলায়।

বিদায়ী খতিব মাওলানা শামসুল হক মিয়াজী উপজেলার পাঠাননগর ইউনিয়নের মধ্যম শিলুয়া গ্রামের মিয়াজি বাড়ির মরহুম এবাদুল্লাহ মিয়াজী মোল্লার ছেলে। তিনি ১৯৭৬ সাল থেকে টানা ৫০ বছর ধরে তার বাড়ির পাশের শিলুয়া চৌধুরী বাড়ি রওশন আরা বেগম চৌধুরানী জামে মসজিদেইমাম ও খতিব হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

অনুষ্ঠানে জানা যায়, এই মসজিদে ইমামতির পেছনে রয়েছে এক অনন্য পারিবারিক ইতিহাস। মাওলানা শামসুল হক মিয়াজীর পূর্বে তার বাবা মরহুম এবাদুল্লাহ মিয়াজি দীর্ঘ ৮১ বছর এবং তার দাদা মরহুম হামিদ উল্যাহ মিয়াজি ৬০ বছর এই একই মসজিদে খতিব ও ইমামের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বাবার নির্দেশনা মেনে এক মসজিদেই নিজের জীবনের মূল্যবান সময় উৎসর্গ করেন শামসুল হক মিয়াজীও।

বার্ধক্যজনিত কারণে মাওলানা শামসুল হক মিয়াজী স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তার সম্মানে এক বিশেষ বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মসজিদ পরিচালনা কমিটি ও এলাকাবাসী। আজ জুমার নামাজ শেষে মসজিদ প্রাঙ্গণে তাকে বিদায় জানানো হয়।

এরপর তাকে একটি ফুল দিয়ে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে বসিয়ে মধ্যম শিলুয়া গ্রামের নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করা হয়। ঘোড়ার গাড়িটির পেছনে ছিল এলাকাবাসীর শতাধিক মোটরসাইকেলের এক বিশাল বহর। পথজুড়ে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে নারীপুরুষ, শিশু ও প্রবীণরা হাত নেড়ে, সালাম ও দোয়ার মাধ্যমে প্রিয় ইমামকে বিদায় জানান। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং অনেকের চোখেই অশ্রু দেখা যায়।

দীর্ঘদিনের দ্বীনি খেদমতের স্বীকৃতিস্বরূপ মসজিদ কমিটি ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে মাওলানা শামসুল হক মিয়াজীকে নগদ ৩ লাখ টাকা এবং বিভিন্ন উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। এছাড়া চৌধুরী বাড়ির পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় যে, আগামী এক বছরের পূর্ণ বেতন, আজীবন পেনশন এবং তার আমৃত্যু যাবতীয় চিকিৎসা ব্যয় বহন করা হবে।

চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী আলমগীর ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান চৌধুরী বলেন, ‘ইমাম সাহেব আমাদের কাছে শুধু একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক। পাঁচ দশক ধরে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। তার এই অবিস্মরণীয় অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই আমাদের এই ক্ষুদ্র আয়োজন।

বিদায়বেলায় আবেগঘন কণ্ঠে মাওলানা শামসুল হক মিয়াজী বলেন, ‘জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় এই মসজিদ ও এলাকার মানুষের সঙ্গে কেটেছে। আমার বাবা ও দাদাও এ মসজিদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাবার নির্দেশে এক মসজিদেই জীবন পার করে দিয়েছি। দ্বীনের খাতিরে নিজের অনেক শখআহ্লাদ কোরবানি দিয়েছি। আজ বিদায় বেলায় মানুষের এত ভালোবাসা ও সম্মান পেয়ে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।

আবদুল্লাহ মামুন

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More