শনিবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৬
শনিবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৬

সরকারি রাস্তায় প্রভাবশালীদের ঘরবাড়ি, অবরুদ্ধ পাঁচ শতাধিক পরিবার

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার গুণধর গ্রামে সরকারি রাস্তা দখল করে বসতবাড়ি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এতে স্থানীয় লোকজন, শিক্ষার্থী ও পথচারীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।দখলের ফলে রাস্তা সরু হয়ে যাওয়ায় গ্রামের বাসিন্দারা অনেকটা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবার ঘর থেকে বের হতে পারছে না।

এ পরিস্থিতিতে দ্রুত রাস্তা দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয়রা জানান, এখন বোরো ধান কাটার মৌসুম চলছে। রাস্তার কারণে কৃষকেরা মাঠ থেকে ধান বাড়িতে আনতে পারছেন না।

গ্রামের পুরাতন বড় মসজিদটি ভেতরে হওয়ায় সরু রাস্তা দিয়ে সেখানে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। রাস্তার একাংশ দখল হয়ে যাওয়ায় কবরস্থানে লাশ নিয়ে যেতেও সমস্যায় পড়ছেন স্থানীয়রা।

গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, রাস্তার দখল করা অংশের পাশাপাশি অবশিষ্ট দুই–তিন ফুট জায়গাও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দখলকারীদের বাড়িঘরের নোংরা পানি ফেলার কারণে ওইসব অংশে সবসময় কাদা জমে থাকে। ফলে রাস্তাটি দিয়ে হাঁটাচলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রামের দক্ষিণের কদিমমাইজহাটি এলাকার মনু ভূঁইয়া মসজিদ থেকে শুরু হয়ে গ্রামের মাঝ দিয়ে উত্তরের বন্দ পর্যন্ত গেছে এই রাস্তা। সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী রাস্তার প্রস্থ ২৬ ফুট। আর যেখানে মোড় রয়েছে, সেখানে প্রস্থ ৩২ থেকে ৩৪ ফুট। প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এই রাস্তার গুণধর গ্রামের ভেতরের প্রায় পুরো অংশজুড়ে বসতবাড়ি নির্মাণ করে রাখা হয়েছে। এতে রাস্তাটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

গুণধর গ্রামের সামনে ও পেছনে হাওর রয়েছে। এসব হাওর থেকে কৃষকেরা এই রাস্তা দিয়েই ফসল বাড়িতে আনেন। দখলের কারণে বর্তমানে রাস্তার অনেক জায়গায় প্রস্থ দুই থেকে তিন ফুটে নেমে এসেছে। ফলে কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারছে না।

রাস্তাটি উদ্ধারের জন্য ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর গ্রামের ১৯৬ জন বাসিন্দা করিমগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন।

অভিযোগের পর ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং রাস্তার মাপ নেন বলে জানান স্থানীয় ইউপি সদস্য দ্বীন ইসলাম দিনু। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকেও দখলদারদের একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

গ্রামবাসীর অভিযোগ, গ্রামের প্রভাবশালী তাহের উদ্দিনের ছেলে দুলাল মিয়া, চন্দু মিয়ার ছেলে আয়নাল, ফালু মিয়ার ছেলে আলমাস, ঝারু শিকদারের ছেলে নুর ইসলাম, মঞ্জিল মিয়ার ছেলে সামিন, গিয়াস উদ্দিনের ছেলে নাইম, জমিন মিয়ার ছেলে মাসুমসহ ১০ থেকে ১২ জন ব্যক্তি এ দখলের সঙ্গে জড়িত। তাদের বারবার বলা হলেও তারা রাস্তা থেকে স্থাপনা সরাচ্ছেন না।

গ্রামের আরিফুল ইসলাম আল আমিন বলেন, “এই রাস্তা আমাদের গ্রামের একমাত্র চলাচলের পথ। এখন ঘর থেকে বের হওয়া, বাজারে যাওয়া, এমনকি জরুরি কাজেও বের হওয়া কঠিন হয়ে গেছে। রাস্তা দখল করে এতটাই সরু করা হয়েছে যে হেঁটেও ঠিকমতো চলাচল করা যায় না। বর্ষায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।”

রহিমা বেগম বলেন, “গ্রামের উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত পুরো রাস্তাজুড়ে ঘরবাড়ি বানিয়ে রাখা হয়েছে। ২৬ ফুটের রাস্তা দখল করতে করতে দুই তিন ফুটে নিয়ে আসা হয়েছে। ওই দুই তিন ফুট রাস্তাতেও এখন নোংরা পানি ফেলে রাখা হয়। বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না। বাড়ি ঘরের উপর দিয়ে স্কুলে যেতে হয়। এ সময় বকাঝকা করে।

শাহ আলম বলেন, “গ্রামের ভেতরে একটা পুরাতন মসজিদ রয়েছে, ওইখানে আমাদের নামাজ পড়তে যেতে হয়, দখলের কারণে রাস্তা এতটাই সরু হয়ে গেছে যে রাস্তার জন্য আমরা এখন মসজিদেও নামাজ পড়তে যেতে পারছি না। গ্রামের কবরস্থানে লাশ নিয়েও যাওয়া যায় না। সরু রাস্তা দিয়ে খাটিয়া ঢুকে না। অথচ এটা সরকারি রাস্তা। রাস্তা দখল হয়ে যাওয়ায় অনেক কষ্টে চলাচল করতে হচ্ছে। জরুরি কাজেও বের হতে সমস্যা হয়।”

কৃষক জালাল উদ্দিন বলেন, “হাওর থেকে ধান আনার জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই রাস্তার ওপর নির্ভর করে আসছি। কিন্তু এখন রাস্তা দখল হয়ে যাওয়ায় এখান দিয়ে যানবাহন চলে না। বাধ্য হয়ে মাথায় করে ধান আনতে হচ্ছে।

এতে সময় বেশি লাগছে এবং খরচও বেড়ে যাচ্ছে, যা আমাদের জন্য সমস্যা তৈরি করছে।”

সাবেক ইউপি সদস্য মো. আবু সাদেক বলেন, “পাঁচ বছর আগেও রাস্তাটি অনেক প্রশস্ত ছিল। গাড়িঘোড়া চলতো। দখলের কারণে রাস্তার অস্তিত্বই এখন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই রাস্তা দিয়ে গ্রামের কৃষকেরা হাওর থেকে ধান ও অন্যান্য ফসল আনেন। বাজারে যেতে হলেও এই রাস্তা দিয়ে যেতে হয়। রাস্তার ওপর গোয়ালঘর, রান্নাঘর ও বসতঘর নির্মাণ করে রাখা হয়েছে। আমরা তো মানুষের বাড়ি ঘরের উপর দিয়ে যেতে চাই না। আমাদের রাস্তা পরিষ্কার করে দেয়া হোক।”

অভিযুক্ত দুলাল মিয়া বলেন, আমরা আমাদের জায়গাতেই বাড়িঘর করেছি। তবে আমার একটি গোয়ালঘর রাস্তার উপর পড়ে গেছে। এটা যে সরকারি জায়গা আমাদের জানা ছিল না। এখন শুনছি সরকারি রাস্তা। আমি শুধু একলা না, অনেক মানুষই সড়কের উপর বসতবাড়ি করেছে। অন্যরা যদি সরে যায়, আমিও আমার ঘর সরিয়ে নেব।”

অন্য অভিযুক্ত আয়নাল বলেন, “বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। প্রশাসন যা সিদ্ধান্ত দেবে, আমরা তা মেনে নেব। তবে আমাদের সময় দিতে হবে। হুট করে ঘর সরানো সম্ভব না।”

আলমাস বলেন, প্রশাসন যদি মাঠে এসে সঠিকভাবে মাপজোক করে, তাহলে যে সিদ্ধান্ত আসবে তারা তা মেনে নেবেন।

অন্যদিকে নুরু মিয়া তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়।

গুণধর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সায়েম রাসেল ভূঁইয়া বলেন, “দখলদারদের একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তারা তিন মাস সময় নিয়েছিল, কিন্তু নয় মাস পার হলেও এখনো রাস্তা ছাড়েনি। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

করিমগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আল আমিন কবির বলেন, “লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। মাপজোকও করেছি। প্রাথমিকভাবে রাস্তা দখলের সত্যতা পাওয়া গেছে। দখলদারদের বাড়িঘর সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। তারা নিজ উদ্যোগে না সরালে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে রাস্তা দখলমুক্ত করা হবে।”

মশিউর নাদিম

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More