শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাজিলের উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে হিউস্টনের স্টেডিয়াম। গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির শেষ মুহূর্তের গোলে জাপানকে ২–১ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করে সেলেসাওরা। জয় নিশ্চিত হওয়ার পরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এমন একজন ফুটবলার, যিনি পুরো ম্যাচে এক মিনিটের জন্যও মাঠে নামেননি। তিনি নেইমার!
চোট কাটিয়ে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে ফিরেছিলেন ব্রাজিলের এই মহা তারকা। তাই জাপানের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে তাকে বদলি হিসেবে দেখা যাবে বলেই ধারণা ছিল। ম্যাচ চলাকালে ডাগআউটের পাশে তাকে গা গরম করতেও দেখা যায়। কিন্তু সময় গড়িয়েছে, বদলি হয়েছে, ম্যাচ শেষ হয়েছে–নেইমার আর মাঠে নামেননি।
আজ ম্যাচ শেষে সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়েছেন ব্রাজিলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি, ‘আমি মূলত অতিরিক্ত সময়ের জন্য নেইমারকে প্রস্তুত রাখছিলাম। আমি ওকে আগেই বলেছিলাম, ম্যাচটি যদি সমতায় না ফেরে, তবে ৬০ বা ৬৫ মিনিটের দিকে সে মাঠে নামবে। কিন্তু আমরা যেহেতু (৫৫ মিনিটে) সমতায় ফিরে আসি, তাই আমি দলের চেনা কাঠামো আর ভাঙতে চাইনি। কারণ ওই সময় পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে চলে এসেছিল।’
আনচেলত্তির সিদ্ধান্ত যে কৌশলগত ছিল, ম্যাচের বাকি সময়েও সেটির প্রতিফলন দেখা যায়। সমতায় ফেরার পর ব্রাজিল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে এবং শেষ পর্যন্ত সুপার সাব মার্তিনেল্লির গোলে জয় নিশ্চিত করে। ফলে নেইমারকে ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামানোর প্রয়োজনই অনুভব করেননি ইতালিয়ান এই কোচ।
তবে ম্যাচের শুরুটা মোটেই ব্রাজিলের পক্ষে ছিল না। ২৯ মিনিটে কাইশু সানোর গোলে এগিয়ে যায় জাপান। পিছিয়ে পড়ার পরও ব্রাজিল নিজেদের ছন্দ হারায়নি। বিরতির পর ৫৬ মিনিটে কাসেমিরোর গোলে সমতায় ফেরে দলটি। এরপর একের পর এক আক্রমণে জাপানের রক্ষণকে চাপে রাখে ব্রাজিল। শেষ পর্যন্ত সেই চাপই সাফল্য এনে দেয়, যখন ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে জয়সূচক গোল করেন মার্তিনেল্লি।
জয়ের আনন্দের মধ্যেও অবশ্য নতুন করে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে ব্রাজিল শিবিরে। গোলদাতা কাসেমিরো এবং মিডফিল্ডার লুকাস পাকেতা দুজনই চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন। নকআউট পর্বের আগে তাদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আনচেলত্তি বলেন, ‘ আগামীকাল ওদের চোট পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। জাপান মোটেও সহজ কোনো দল নয়, তারা অত্যন্ত সুসংগঠিত।’
চোটের ধাক্কা থাকলেও স্কোয়াডের গভীরতা নিয়ে আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছেন না ব্রাজিল কোচ। বিকল্প খেলোয়াড়দের ওপর আস্থা রেখে তিনি বলেন, ‘আমাদের বেঞ্চ এবং মাঠ–দুই জায়গাতেই প্রচুর বিকল্প বা সম্পদ রয়েছে। এটা খুবই ইতিবাচক যে খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত ফর্মে আছে এবং মাঠে সবাই দলগতভাবে এক হয়ে কাজ করছে।’
ম্যাচের পারফরম্যান্স নিয়েও সন্তুষ্ট আনচেলত্তি। তার মতে, প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়লেও ব্রাজিল কখনো পরিকল্পনা থেকে সরে যায়নি। ধৈর্য ধরে নিজেদের ফুটবল খেলেছে বলেই জয় এসেছে। ম্যাচ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আসলে আমরা দারুণ ফুটবল খেলেছি এবং এই জয় আমাদের প্রাপ্য ছিল। আমরা বেশ কিছু গোলের সুযোগ মিস করেছি সত্যি, কিন্তু দল কখনো ধৈর্য হারায়নি। প্রথমার্ধেও আমাদের পারফরম্যান্স ভালো ছিল। এটি একটি চমৎকার ম্যাচ ছিল; প্রথমার্ধে আমরা উইং দিয়ে প্রচুর ক্রস করার চেষ্টা করেছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত সেই কৌশলই আমাদের জন্য দারুণভাবে কাজ করেছে।’
নাটকীয় এই জয়ে বিশ্বকাপে ব্রাজিল শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে। তবে ম্যাচ শেষে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে থাকল নেইমারের বেঞ্চে বসে থাকা এবং সেই সিদ্ধান্তের পেছনে আনচেলত্তির কৌশলগত ব্যাখ্যা!