দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন ও ভাতা কাঠামোর আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে শনিবার ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ নামে প্রজ্ঞাপনটি প্রকাশ করা হয়।
নতুন পে-স্কেলে গ্রেডভেদে মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হলেও সব ভাতার হার একইভাবে বাড়ানো হয়নি। বরং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাতার হার কমানো হয়েছে।
তবে ভাতার শতকরা হার কমলেও সব ক্ষেত্রে কর্মীদের হাতে পাওয়া অর্থ কমবে- বিষয়টি এমন নয়। কারণ নতুন কাঠামোয় মূল বেতন বাড়ানো হয়েছে। ফলে মূল বেতনের শতাংশ হিসেবে নির্ধারিত কোনো ভাতার হার কমলেও নতুন মূল বেতনের ওপর হিসাব হওয়ায় প্রকৃত টাকার অঙ্ক অনেক ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি হতে পারে।
বাড়িভাড়া ভাতায় বড় পরিবর্তন
নতুন পে-স্কেলে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমানো হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া দেওয়া হয়।
নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ হার ৬৫ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে নেমেছে।
ঢাকার বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার উপজেলা এলাকায় বর্তমানে মূল বেতনের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ বাড়িভাড়া পাওয়া যায়। নতুন কাঠামোয় এই হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা ও অন্যান্য সিটি করপোরেশন এবং সাভারের বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া বর্তমানে মূল বেতনের ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ। নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ করা হয়েছে।
তবে নতুন মূল বেতন বাড়ার কারণে ভাতার প্রকৃত টাকার পরিমাণ নির্ধারণে পুরোনো ও নতুন মূল বেতনের পার্থক্যও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলা নববর্ষ ভাতাও কমেছে
নতুন কাঠামোয় বাংলা নববর্ষ ভাতার হারও কমানো হয়েছে। এতদিন সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে এ ভাতা পেতেন।
নতুন পে-স্কেলে তা কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ এ ভাতার হার ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে।
তবে মূল বেতন বৃদ্ধির কারণে নতুন কাঠামোয় ১৫ শতাংশ হিসাব করেও অনেক কর্মীর প্রাপ্য অর্থ আগের ২০ শতাংশের চেয়ে বেশি হতে পারে। বিষয়টি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্মীর পুরোনো ও নতুন মূল বেতনের ওপর।
যেসব ভাতা কমেনি
নতুন পে-স্কেলে সব ভাতায় পরিবর্তন আনা হয়নি। শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটিজ অ্যালাউন্স, উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি-বিনোদন ছুটি ও ভাতার বিদ্যমান হার ও পরিমাণ বহাল রাখা হয়েছে।
দুর্গম পার্বত্য এলাকায় কর্মরতদের পাহাড়ি ভাতার হার মূল বেতনের ২০ শতাংশ রাখা হলেও এর সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পার্বত্য জেলা ও উপজেলা সদরের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা এবং সদর এলাকার বাইরে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
হাওর, দ্বীপ ও চর এলাকার ভাতার হারও মূল বেতনের ২০ শতাংশ রাখা হয়েছে। তবে এ ভাতার সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঝুঁকি ভাতাসহ কিছু বিশেষ ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
উচ্চ গ্রেডে কমছে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট
ভাতার পাশাপাশি নতুন কাঠামোয় বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হারেও পরিবর্তন এসেছে। ২০তম থেকে ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার ৫ শতাংশ বহাল রাখা হয়েছে। তবে এর ওপরে উচ্চতর গ্রেডে হার ধাপে ধাপে কমবে।
নতুন ব্যবস্থায় পঞ্চম গ্রেডে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৪ শতাংশ, চতুর্থ ও তৃতীয় গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীতেও একই ধরনের কাঠামো রাখা হয়েছে। ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং তার নিচের পদে ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পদে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের বিধান রাখা হয়েছে।
ধাপে ধাপে কার্যকর হবে নতুন বেতন
নতুন পে-স্কেল ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হলেও পুরো বেতন বৃদ্ধি একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ পাবেন। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত এ হার হবে যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশ। এরপর ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বাড়তি মূল বেতনের শতভাগ কার্যকর হবে।
নতুন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হওয়ায় ওই সময় থেকে প্রাপ্য বকেয়া বেতন পাওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে নতুন কাঠামোর অন্যান্য ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।