জ্বালানী তেলের সংকটের মধ্যেই তেল অপচয় করে বিশাল গাড়িবহর নিয়ে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট।
জ্বালানী তেলের সংকট নিরসনসহ বিভিন্ন দাবিতে করা এমন কর্মসূচির যৌক্তিকতা নিয়ে তাই উঠেছে প্রশ্ন। এছাড়ও লংমার্চ কর্মসূচি থেকে দেওয়া হয় নানা উসকানিমূলক বক্তব্য।
এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন স্থানে সৃষ্ট তীব্র যানজটে দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ। কোথাও কোথাও তারা তৈরি করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। তারপরও সরকার এই লংমার্চে কোনো প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি না করে অত্যন্ত ধৈর্যের পরিচয় ও সহনশীল রাজনীতির বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, অতীতে এমনটা দেখা যায়নি। দীর্ঘ দেড় যুগ পর সরকারের কোনো রকম বাধা ছাড়া বিরোধীদল এরকম কর্মসূচি পালনের সুযোগ পেলো।
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের চিত্র ছিলো ঠিক উল্টো। বিরোধী দল ও মতের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও দমন পীড়ন চালানো হতো। যা রাজনীতির জন্য খুবই নেতিবাচক ধারা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সুস্থ রাজনীতির চর্চা শুরু করেছে। অতীতের পথে হাটছে না বর্তমান সরকারের প্রশাসন। যা খুবই ইতিবাচক।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপি লংমার্চ, রোডমার্চ, সভা–সমাবেশ ও আন্দোলন কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দমন–পীড়ন ও আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা হামলা চালিয়েছে। কর্মসূচির আগে থেকেই চলেছে গণগ্রেপ্তার। অনেক ক্ষেত্রে কর্মসূচি পণ্ড করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যতিক্রম হয়েছে গত ৫ সেপ্টেম্বর কর্মসূচিতে।
‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ–জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং প্রশাসনে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে লংমার্চ করে ১১ দলীয় ঐক্যজোট। এই লংমার্চে সরকার কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা তো দূরের কথা, চেষ্টাও করেনি। এজন্য সরকারকে সাদুবাদ জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘এটা তো একটা গণতান্ত্রিক সরকার। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। আমার মনে হয় এই সরকারের নীতিটাই এমন যে, ভিন্ন মত দমন করা হবে না। ভিন্ন মত প্রচারের, প্রকাশের অবাদ সুযোগ রয়েছে। তারা লংমার্চ করেছে, এটা তাদের একটা গণতান্ত্রিক অধিকার।
তিনি আরও বলেন, সরকার কোন বাধা দেয় নাই, বাধা দেওয়ার কোনরকম চেষ্টাও করেনি। এটা আমি খুব ভালো একটা লক্ষণ আমি মনে করি। গণতন্ত্রে এটাই হওয়া উচিত। এজন্য আমি সরকারকে সাধুবাদ জানাই। বিরোধীদলকে আমি বলবো আপনারা প্রতিবাদ করেন; তবে তা সুশৃঙ্খল এবং নিয়মতান্ত্রিক ভাবে করেন।’
লংমার্চের আগে জোটের নেতারা ধারণা করেছিলেন হয়তো অতীতের মত ঘটনা ঘটতে পারে। সরকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। সেজন্য তারা কর্মসূচিতে বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সরকারও তাদের যাত্রাপথে কোনো রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেনি। তারা পথসভা করেছে, সরকারের সমালোচনা করেছে এবং নির্ধারিত সমাপনী কর্মসূচিও পালন করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “জামায়াত আসলে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। তারা ৬ মাসের একটি সরকারকে পতন ঘটনার দাবি তুলছে। এটা তো দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।”
তিনি আরও বলেন, “তবে বিএনপি সরকার লংমার্চ করার জন্য তাদের নিরাপত্তা দিয়ে ও কোনো ধরণের বাধা না দিয়ে উদারতার প্রমাণ দিয়েছে। যেটি আমরা বিগত সরকারের সময় দেখিনি।”
অতীতে কি হতো?
১৯৯৮ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখে বিএনপির লংমার্চ কাঁচপুরে আটকে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’, ২০২৩ সালের ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচি এবং ২০২৪ সালের কালো পতাকা মিছিলেও বিএনপিকে বাধা দেওয়া হয়। বিভিন্ন কর্মসূচিতে দলটির নেতা–কর্মীদের ওপর হামলাও চালানো হয়।
২০১০ সাল বিএনপি চট্টগ্রামে লং মার্চ করে। এই লংমার্চে আওয়ামী লীগ সরকার বড় রকমের বাধা দেয়। বিএনপি নেতাকর্মীদের গনগ্রেপ্তার করা হয়। ২০১২ সালে তিস্তা পানি বন্টন চুক্তিতে করা লংমার্চে গাড়ি বহওে পুলিশি তল্লাসি করা হয়। কয়েক জেলার নেতাকর্মীদেও গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৪ সালে তিস্তা লংমার্চেও সরকার বাধা দেয়। ২০২৪ সালে সিপিবি–বাসদের লংমার্চেও সরকার প্রতিবন্দকতা সৃষ্টি করে।
আওয়ামী লীগ সরকার সমালোচনা নিতে পারতো না। তারা ক্ষমতায় থাকলে বিরোধী দল যেসব লংমার্চ রোডমার্চ করেছে সেগুলোয় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতে বেশ কয়েকটি পন্থা অবলম্বন করতো। তার মধ্যে রয়েছে— গণগ্রেপ্তার, পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, রেল নৌ সড়ক সব পথেও যান চলাচল বন্ধ করে দিতো।
কর্মসূচিতে কেন্দ্র করে নির্ধারিত তারিখের আগে–পরে অঘোষিত সরকারী হরতাল চলতো। চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাসির নামে হয়রানি করা হতো। গোয়েন্দা নজরদারির নামে আতঙ্ক সৃষ্টি করতো। এছাড়া সমাবেশস্থল বার বার পরিবর্তন করাতো। সরকারের অনুমিত মিলতো না। অনুমতি মিললেও স্থান পরিবর্তনের নামে নানা তলবাহানা করা হতো।
সেই অভিজ্ঞতার বিপরীতে ১১ দলের লংমার্চ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যেতে কোনো বাধার মুখে পড়েনি। ঢাকা শহরের শাপলা চত্বর থেকে শুরু হওয়া লংমার্চটি ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হয়।
পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা করেন জোট নেতারা। সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য, দাবি ও রাজনৈতিক চাপ তৈরির কর্মসূচি হওয়া সত্ত্বেও তা প্রশাসনিক বা দলীয় শক্তি দিয়ে ঠেকানো হয়নি।
এই লংমার্চ অন্তত একটি বার্তা দিয়েছে—রাজনৈতিক বিরোধিতার জবাব বাধা বা হামলা দিয়েই দিতে হবে, এমন নয়। সরকার বিরোধী দলের দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেও তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির সুযোগ দিতে পারে। এই চর্চা অব্যাহত থাকলে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও সহনশীল সংস্কৃতি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মাসউদ/এসএ