২৫ বছর ধরে বোমা ফেলছে যুক্তরাষ্ট্র, কেড়েছে ৪৫ লাখের বেশি প্রাণ

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

আলকায়েদার ১৯ হামলাকারী চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে আঘাত হানার ২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। ওই হামলায় প্রাণ হারান প্রায় ৩ হাজার মানুষ।

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হয় একের পর এক যুদ্ধ, যা একটি প্রজন্মের জন্য ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ বদলে দেয়। ২০০১ সালের পর থেকে এমন কোনো বছর নেই, যখন বিশ্বের কোথাও না কোথাও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বোমা হামলা চালায়নি। এসব যুদ্ধে লাখো মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে।

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় ১৮ বছর বয়সী ছিলেন ওমর। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘সবকিছু বদলে গিয়েছিল।’ ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র (ডব্লিউএমডি) থাকার মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে ইরাকে যুদ্ধ শুরু করা হয়েছিলসেই স্মৃতিও তিনি তুলে ধরেন।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’: প্রাণ গেছে ৪৫ লাখের বেশি

/১১ হামলার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা চালায়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এটিকে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেন। এরপর আফগানিস্তান, ইরাক এবং মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে শুরু হয় একের পর এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আনুমানিক ৪৫ লাখ থেকে ৪৭ লাখ মানুষ মারা গেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু সরাসরি যুদ্ধের কারণে। আর রোগ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জটিলতায় পরোক্ষভাবে মারা গেছেন ৩৬ লাখ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ।

আফগানিস্তান: সরাসরি যুদ্ধে নিহত ১ লাখ ৭৬ হাজার

২০০১ সালের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম’ শুরু করে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তালেবান সরকারের পতন ঘটে। কিন্তু যুদ্ধ চলতে থাকে প্রায় ২০ বছর। চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মেয়াদজুড়ে চলা এই যুদ্ধ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সংঘাত।

কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আফগানিস্তানে সরাসরি যুদ্ধের কারণে আনুমানিক ১ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ মারা যান। ক্ষুধা, রোগ ও চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে আরও কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

যুদ্ধের আগে আফগানিস্তানের ৬২ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। যুদ্ধের পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ শতাংশে। যুদ্ধের সময় পুঁতে রাখা অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ ও স্থলমাইন এখনো বেসামরিক মানুষকে হত্যা ও পঙ্গু করছে।

২০২১ সালে তালেবান আবারও আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

ইরাক: সরাসরি যুদ্ধে নিহত ৩ লাখ ১৫ হাজার

এর দুই বছরেরও কম সময় পর, ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা শুরু করে।

যুদ্ধ শুরুর সময় ওমরের বয়স ছিল ১৮ বছর। তিনি বলেন, “আমরা বোমার শব্দ শুনতাম। আমরা খুব ভয় পেতাম।”

যুদ্ধ যখন বাগদাদে পৌঁছে যায়, তখন কী ঘটছে তা দেখতে ওমরের কয়েকজন বন্ধু বেরিয়ে গিয়েছিলেন, যদিও তিনি তাদের সতর্ক করেছিলেন। ওমর বলেন, “আমি তাদের বলেছিলাম, তোমরা কেন যাচ্ছ? এরপর তারা গেল। কিন্তু আর ফিরে আসেনি। মনে পড়লে খুব খারাপ লাগে।”

বিমান ও ড্রোন হামলা

স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, আফগানিস্তান এবং ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসবিরোধী অভিযানে ব্যাপকভাবে বিমান ও ড্রোন হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এসব অভিযানের অনেকগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।

২০০৪ সাল থেকে ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের হিসাবেপাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ৪২৩টি হামলা চালিয়েছে। এতে আনুমানিক ২ হাজার ৪৯৯ থেকে ৪ হাজার ১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ৪২৪ থেকে ৯৬৬ জন।

ইয়েমেনে অন্তত ১৮৬টি হামলা ও অভিযান চালানো হয়। এতে অন্তত ৮৫৩ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ১৫৮ জন বেসামরিক নাগরিক।

সোমালিয়ায় ২০০১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ১৯ থেকে ২৩টি হামলায় ১৮৮ থেকে ২৭৬ জন নিহত হন।

২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে লিবিয়ায় বিক্ষোভ দমনের সময় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য জাতিসংঘের ম্যান্ডেটের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর নেতৃত্বে বিমান হামলা শুরু হয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, সাত মাসে লিবিয়ায় প্রায় ৯ হাজার ৭০০টি হামলা চালানো হয়। পরে বিদ্রোহীদের হাতে গাদ্দাফি আটক ও নিহত হন।

২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসবিরোধী যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযান ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’ শুরু হয়। এতে ব্যাপক বিমান ও স্থল অভিযান চালানো হয় এবং হাজার হাজার বোমা নিক্ষেপ করা হয়।

২০১৮ সালের মধ্যে ওই অভিযানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি ঘটে। মার্কিন কর্মকর্তারা ১ হাজার ৪১৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও সামরিক অভিযানে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব রাখা লন্ডনভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা এয়ারওয়ার্সের ধারণা, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৮ হাজার ২৬৪ থেকে ১৩ হাজার ৩৬০ জনের মধ্যে।

বাস্তুচ্যুত ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি

কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, /১১পরবর্তী যুদ্ধগুলোর কারণে আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাদের কেউ দেশ ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ নিজ দেশেই ঘরবাড়ি হারিয়েছেন।

দুই দশকের বেশি সময় পরও মানুষ ঘরছাড়া হচ্ছেন।

গত বছর ইরান ও পাকিস্তান প্রায় ২৯ লাখ আফগানকে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করে। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের দুই দশক পরও ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন।

৪০ বছর বয়সী আফগান মা আয়েশা জীবনের বড় একটি সময় আফগানিস্তান ও ইরানের মধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়ে কাটিয়েছেন। ১৯৯৪ সালে প্রথমবার পরিবার নিয়ে আফগানিস্তান ছেড়েছিলেন তিনি। ২০০০ সালে ফিরে আসেন। কিন্তু ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর আবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

ইরানে ১১ বছর থাকার পর আয়েশা ও তার সন্তানদের বহিষ্কার করা হয় এবং তাদের আফগানিস্তানে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়।

আয়েশা বলেন, “আমি বহুবার গিয়েছি, আবার ফিরে এসেছি। এবার আমরা ১১ বছর সেখানে ছিলাম। কিন্তু ইরানিরা আমাদের বের করে দিল। আমার সন্তানদের স্কুল থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছিল।”

মার্কিন সেনাদের ওপরও যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

আফগানিস্তানে ৮ লাখের বেশি মার্কিন সেনা দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালে সর্বশেষ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত সেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত এবং ২০ হাজার আহত হন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মিত্রবাহিনীর সদস্য মিলিয়ে নিহত হন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জন এবং আহত হন ২৩ হাজার ৫০০ জনের বেশি।

ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, ইরাক যুদ্ধে ৩ হাজার ৪৮১ জন মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত এবং ৩১ হাজারের বেশি আহত হন। অনেক সাবেক সেনা এখনো মানসিক স্বাস্থ্যসংকটে ভুগছেন।

কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের পরিচালক স্টেফানি স্যাভেল আল জাজিরাকে বলেন, “/১১পরবর্তী যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনার তুলনায় আত্মহত্যায় মারা গেছেন প্রায় চার গুণ বেশি সেনা ও সাবেক সেনা।”

তিনি বলেন, “যারা ফিরে আসছেন, তাদের মধ্যে পিটিএসডি ও গুরুতর আঘাতের হার বেশি। ইতিহাসের আগের সময়ের তুলনায় তাদের আরও বেশি বার যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। ফলে যুদ্ধের মূল্য পুরো জনগোষ্ঠী নয়, বরং সমাজের নির্দিষ্ট একটি অংশকে বেশি বহন করতে হচ্ছে।”

যুদ্ধের ব্যয় অন্তত ৮ ট্রিলিয়ন ডলার

দুই দশকের যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র আনুমানিক ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। আগামী কয়েক দশকে সাবেক সেনাদের জন্য আরও ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের হিসাব রয়েছে। সব মিলিয়ে যুদ্ধের মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে অন্তত ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে।

২০৩০ সালের মধ্যে যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় করবে যুক্তরাষ্ট্র। আর এই ঋণের বোঝা বহন করতে হবে আজকের ২৫ বছরের কম বয়সী মার্কিন নাগরিকদের।

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বিদেশে আগ্রাসী যুদ্ধ চালানোর বিষয়ে মার্কিন জনগণের আগ্রহ কম। ইরানের চলমান যুদ্ধও দেশটির জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়।

স্যাভেলের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যারা ভোট দিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ বন্ধ এবং শান্তির প্রতিশ্রুতির কারণেও তাকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু তার ক্ষমতায় আসার পর বাস্তবতা হয়েছে এর উল্টো।

তিনি বলেন, সোমালিয়া ও ইয়েমেনে বিমান হামলা বেড়েছে, সামরিক অভিযানে হামলার নিয়ম শিথিল করা হয়েছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা কমানো হয়েছে।

স্যাভেল বলেন, “এর সঙ্গে ইরানে এই যুদ্ধ শুরু করা, ক্যারিবীয় অঞ্চলে নৌকায় হামলাসব মিলিয়ে প্রায় সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সহিংসতা বাড়ছে। সূত্র: আল জাজিরা।

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More