প্রকৃতির এক বিস্ময়কর রূপ হলো বৃষ্টিপাত। ঋতুভেদে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময় বৃষ্টি হয়ে থাকে। তবে বিশ্বের এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে, যেখানে বৃষ্টি কোনো সাময়িক আবহাওয়া নয়, বরং প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপ্রবণ ও সর্বোচ্চ রেকর্ডের অধিকারী সেইসব অঞ্চল ও তাদের আবহাওয়ার রোমাঞ্চকর খতিয়ান নিয়ে এই প্রতিবেদন।
১. মৌসিনরাম (ভারত):
গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড পাতায় বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ‘আর্দ্র’ বা ‘ভেজা’ স্থান হিসেবে জ্বলজ্বল করছে মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি গ্রাম ‘মৌসিনরাম’–এর নাম। খাসি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই গ্রামে বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৮৭১ মিলিমিটার (৪৬৭ ইঞ্চি বা প্রায় ৩৯ ফুট)।
বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা তীব্র জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু খাসি পাহাড়ের দেয়ালে এসে বাধা পায়। পাহাড়ের আকৃতির কারণে এই বাতাস বাধ্য হয়ে ওপরের দিকে উঠে যায় এবং দ্রুত ঘনীভূত হয়ে মৌসিনরামে অবিরাম ধারায় ঝরে পড়ে।
মৌসিনরাম বাসিন্দারা ঘরের বাইরে বের হলেই বাঁশ ও কলার পাতা দিয়ে তৈরি বিশেষ এক ধরনের ছাতা (স্থানীয় ভাষায় ‘কনুপ’) ব্যবহার করেন, যা পিঠসহ পুরো শরীরকে ঢেকে রাখে। এখানে বৃষ্টি কোনো সাময়িক দুর্যোগ নয়, বরং জীবনযাত্রারই অংশ।
২. চেরাপুঞ্জি (ভারত):
আধুনিক আবহাওয়ার ইতিহাসে ১ মাসে ও ১ বছরে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের সর্বকালের রেকর্ড দখল করেছে চেরাপুঞ্জি।
১৮৬০ সালের ১ আগস্ট থেকে ১৮৬১ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১২ মাসে চেরাপুঞ্জিতে রেকর্ড ২৬ হাজার ৪৭০ মিলিমিটার (১ হাজার ৪২ ইঞ্চি বা ৮৬ ফুট) বৃষ্টিপাত হয়েছিল! এই পরিমাণ বৃষ্টি পৃথিবীর আর কোথাও কোনোদিন দেখা যায়নি।
আর ১৮৬১ সালের জুলাই মাসে একক কোনো মাস হিসেবে এখানে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। অর্থাৎ মাত্র ১ মাসেই প্রায় সাড়ে ৯ মিটার বা ৩১ ফুট পানির স্তর!
যদিও চেরাপুঞ্জিতে এখন বনায়ন হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমেছে, তবুও ইতিহাসের পাতায় এর রেকর্ড আজও অক্ষুণ্ন।
৩. রেউনিওঁ দ্বীপ (ফ্রান্স):
যদি প্রশ্ন করা হয়, মাত্র ১ দিনে বা ২৪ ঘণ্টায় পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছিল কোথায়? তবে চোখ ফেরাতে হবে ভারত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ফরাসি দ্বীপ রেউনিওঁ (Réunion Island)-এর দিকে।
এই পাহাড়ি দ্বীপে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনের প্রলেপ যখন লাগে, তখন আকাশ যেন আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে পড়ে। ১৯৬৬ সালের ৭ থেকে ৮ জানুয়ারি এই দ্বীপে আঘাত হেনেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘ডেনিস’। সেসময় দ্বীপের ফক–ফক (Foc-Foc) স্থানটিতে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ১ হাজার ৮২৫ মিলিমিটার (৭১.৮ ইঞ্চি বা প্রায় ৬ ফুট) বৃষ্টিপাত হয়েছিল!
৪. ললো ও লোপেজ ডি মিকাই (কলম্বিয়া):
কলম্বিয়ার চোকো (Chocó) ডিপার্টমেন্টের অন্তর্গত ললো (Lloró) ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের লোপেজ ডি মিকাই (López de Micay) অঞ্চল দুটিকে মৌসিনরামের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বলা চলে।
ললো অঞ্চলে বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৭১৮ মিলিমিটার বা প্রায় ৪২ ফুট। এখানকার আবহাওয়া এতটাই আর্দ্র যে, আন্দিজ পর্বতমালার আর্দ্র বায়ু প্রশান্ত মহাসাগরের বাতাস আটকে দিয়ে এখানে প্রায় প্রতিদিনই দুপুরের পর বা রাতে প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটায়।
৫. মাউন্ট ওয়ায়ালেয়ালে (হাওয়াই, যুক্তরাষ্ট্র):
প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত কাউয়াই দ্বীপের একটি আগ্নেয় পর্বত হলো মাউন্ট ওয়ায়ালেয়ালে (Mount Waialeale)। স্থানীয় ভাষায় ওয়ায়ালেয়ালে শব্দের অর্থ হলো ‘উতলে ওঠে পানি’।
এই পাহাড়ি অঞ্চলে বছরে গড়ে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ মিলিমিটার প্রায় ৩৮ ফুট বৃষ্টিপাত হয়। আগ্নেয়গিরির খাড়া ঢাল ও সমুদ্রের আর্দ্র বায়ুর মিলনে এখানে প্রায় সারাবছরই মেঘ থমথম করে। বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ৩৫০ দিনই এখানে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়ে থাকে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বছরে গড় বৃষ্টিপাত হয় প্রায় ২ হাজার ৩০০ মিলিমিটার। দেশের সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা সিলেট জেলার লালাখাল, এখানে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৪ হাজার ১৮০ মিলিমিটার বা প্রায় ১৪ ফুট। অর্থাৎ, বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল অঞ্চল মৌসিনরামের তুলনায় তা অর্ধেকেরও কম!
এসএ