শনিবার, এপ্রিল ১১, ২০২৬
শনিবার, এপ্রিল ১১, ২০২৬

খানজাহান আলীর মাজারে কুমিরের আক্রমণে কুকুরের মৃত্যু ঘিরে তোলপাড়

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর মাজার প্রাঙ্গণে অবস্থিত দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর নিহত হওয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে পশুপ্রেমীসহ সাধারণ মানষের মাঝে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।

এরইমধ্যে বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুনকে প্রধান করে এবং জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা মো. ছায়েব আলী ও সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তদন্ত মো. শহিদুল ইসলামকে সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, কুকুরটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত ছিল। পাশাপাশি পৌর এলাকায় জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুর থাকলে ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, খানজাহান আলীর মাজার সংলগ্ন দিঘিতে দীর্ঘদিন ধরে কুমির বসবাস করে আসছে; যা দিঘিটির ইতিহাসঐতিহ্য বহন করে। প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী মানত নিয়ে এখানে আসেন। অনেকে কুমিরকে হাঁস, মুরগি ও ছাগল দিয়ে থাকেন।

অভিযোগ রয়েছে, দর্শনার্থীদের দেওয়া মানতের হাঁস, মুরগি ও ছাগল কুমিরকে না দিয়ে আত্মসাত করেন মাজারের খাদেম ও ফকিররা। এছাড়া মাজারে আগত পর্যটকদের কবর জিয়ারত করানোর নামে জোরপূর্বক টাকা আদায় এবং প্রতিবাদ করলে মারধরের অভিযোগও রয়েছে খাদেম ও ফকিরদের বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাজার সংলগ্ন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, মাজারকে কেন্দ্র করে খাদেম ও ফকিরদের সমন্বয়ে একটি চক্র বছরের পর বছর ধরে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রধান আয়ের উৎস দর্শনার্থীদের মানত।
অপরদিকে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাজারের খাদেম ও ফকিররা। মাজারের নিরাপত্তাকর্মী মো. ফোরকান বলেন, কুকুরটি আসলে অসুস্থ ছিল। জলাতঙ্কে আক্রান্ত বলে মনে হচ্ছিল। যাকে পাচ্ছিল তাকেই কামড় দিচ্ছিল। ঘটনার দিন দুইতিনজনকে কামড় দেয়, এমনকি আমাকেও কামড়েছে। আমার সামনেই আরও একজনকে কামড়াতে যাচ্ছিল। তাই কুকুরটিকে উদ্ধার করার মতো পরিস্থিতি তখন ছিল না। তাকে কোথায় কামড়েছে জানতে চাইলে তিনি তার পা দেখালেও সেখানে কামড়ের কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি।

কুকুরটিকে কেন বাঁচালেন না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কুকুরটি নিজে থেকে ওপরে উঠতে পারছিল না। পা পিছলে যাওয়ায় বারবার উঠতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছিল। এরই মধ্যে কুমির চলে আসায় ভয়ে আমি এগিয়ে যেতে পারেননি।

মাজারের ঘাটের পাশের দোকানি বিনা ফকির বলেন, কুকুরটি তার দোকানের সামনে কয়েকজনকে আক্রমণ করেছিল এবং একটি শিশুকেও কামড় দেয়। কুকুরটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত বলে মনে হচ্ছিল এবং যাকে পাচ্ছিল তাকেই কামড় দিচ্ছিল। এমনকি আমার নিজের একটি মুরগিও কুকুরটি খেয়ে ফেলেছিল। পরে কুকুরটি পানিতে পড়ে গেলে দিঘির কুমির সেটিকে ধরে নিয়ে যায়।

মাজারের খাদেম মেহেদী হাসান তপু বলেন, গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে একটি কুকুরকে কুমির খেয়ে ফেলেছে বলে দাবি করা হয়, তা আসলে বিভ্রান্তিকর। প্রকৃত ঘটনা ভিন্ন। কুকুরটিকে কুমির ধরার সময় অনেক মানুষ উপস্থিত থাকলেও কেউ এগিয়ে গিয়ে উদ্ধার করার চেষ্টা করেননি।

তিনি আরও বলেন, কুকুরটি আগে থেকেই অসুস্থ ছিল এবং এর আগে কয়েকজন মানুষকে কামড়েছে। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি ডিম পাড়ার পর কুমিরটি আক্রমণাত্মক আচরণ করছিল। কুমিরটি কুকুরটিকে আক্রমণ করলেও সেটিকে খেয়ে ফেলেনি। পরে কুকুরটিকে একটি জায়গায় ফেলে দেয়। সেখান থেকে মাজারের দারোয়ান কুকুরটিকে উদ্ধার করেন এবং পরে সেটিকে মাটি চাপা দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে দাবি করা হয়েছে, যে কুকুরটিকে বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, তা সঠিক নয়।

মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তরিকুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে সুপেয় পানির সমস্যা সমাধানে হযরত খানজাহান আলী প্রায় সাড়ে ৩ শতাধিক দিঘি ও পুকুর খনন করেন। দিঘিটি খননের পর পানি যাতে কেউ নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য ‘কালা পাড়া’ ও ‘ধলা পাড়া’ নামের দুটি কুমির দিঘিতে ছেড়ে দেন। পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কালা পাড়া ও ধলা পাড়ার কুমিরের বংশধর বিলুপ্ত হলে মাজারের ঐতিহ্য রক্ষায় ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে ৬টি মিঠাপানির কুমির এনে মাজারের দিঘিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০২৩ সালে একটি কুমির মারা যায় এবং বাকি ৪টি কুমিরকে সুন্দরবনের কুমির প্রজনন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।

মামুন আহমেদ/এজে/দীপ্ত সংবাদ

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More