বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় আবারও বনদস্যুদের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। মাছ, কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহে বনে যাওয়া জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি এবং নৌকাপ্রতি চাঁদা আদায়ের অভিযোগ একাধিক দস্যু বাহিনীর বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন পর সুন্দরবনে আবারও এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বনজীবীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিভিন্ন নদী ও খালে জেলে ও বনজীবীদের অপহরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা রেঞ্জের মালঞ্চ নদীর হাসখালী, চেলাকাটা ও হেতালবুনে খাল এলাকা থেকে সাত জেলেকে অপহরণ করে ‘ডন বাহিনী’। তাদের বিরুদ্ধে মাথাপিছু ৪০ হাজার টাকা মুক্তিপণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এরপর ২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি মামুন্দো ও মালঞ্চ নদীর খাল এলাকায় মাছ ধরার সময় ‘ডন বাহিনী’ পরিচয়ে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ১৮ জেলেকে অপহরণ করেছে। এ ঘটনায় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলের জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তবে বছরের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি ঘটে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪ ও ৫ মে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের চুনকুড়ি, মামুন্দো ও মালঞ্চ নদীর বিভিন্ন খাল থেকে অন্তত ২০ জন জেলে ও মৌয়ালকে অস্ত্রধারীরা অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে একই সময়ের ঘটনায় ২২ জেলে অপহরণের কথা বলা হয়েছে। পরে কয়েক দফা দর–কষাকষির পর মুক্তিপণ দিয়ে ১৮ জন বনজীবী ফিরে আসেন।
সুন্দরবনের পূর্ব অংশেও বছরের শুরুতে দস্যু তৎপরতার ঘটনা ঘটে। ২ জানুয়ারি রাতে খুলনার দাকোপের চাঁদপাই রেঞ্জের ঢাংমারী স্টেশনের ঘাগরামারী টহল ফাঁড়ি–সংলগ্ন কেনুয়ার খাল এলাকা থেকে একটি রিসোর্টের মালিক ও দুই পর্যটককে অপহরণের কথা জানায় পুলিশ।
এদিকে, বন্যপ্রাণী ও মাছের প্রজনন মৌসুমে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও পর্যটকদের জন্য আবার সুন্দরবন খুলে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ বিরতির পর বনজীবীরা জীবিকার সন্ধানে বনে ফিরলেও তাদের সেই ফেরার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দস্যু আতঙ্ক। সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে সাতক্ষীরা রেঞ্জের জেলেদের কাছ থেকে নৌকাপ্রতি ৭৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠে আসে। তবে এসব অর্থ আদায়ের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট বনজীবীদের বক্তব্য হিসেবে এসেছে; এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা রেঞ্জে বুড়িগোয়ালিনী, কদমতলা, কোবাদক ও কৈখালীসহ বিভিন্ন স্টেশনের মাধ্যমে বনজীবীদের মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণের অনুমতি দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে সাতক্ষীরা রেঞ্জে মাছ ধরা ও ইকোট্যুরিজমের জন্য ২ হাজার ৯৩৮টি বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) নবায়ন করা হয়েছিল। ১ সেপ্টেম্বর দুপুর পর্যন্ত ১৫৯টি পাস ইস্যু করা হয়, যার মাধ্যমে চার শতাধিক জেলে–বাওয়ালি বনে প্রবেশের অনুমতি পান।
বন বিভাগের তথ্য আরও বলছে, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার বড় একটি অংশ মাছ, কাঁকড়া, মধু, মোমসহ বিভিন্ন বনজ ও জলজ সম্পদ আহরণের সঙ্গে যুক্ত।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে শুধু সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকেই ৮৭৭ কুইন্টাল মধু ও ২৬৩ কুইন্টাল মোম সংগ্রহের তথ্য জানিয়েছে বন বিভাগ। মধু সংগ্রহের জন্য ২৬০টি পাস নিয়েছিলেন মৌয়ালরা।
অন্যদিকে, সুন্দরবন শুধু বনজীবীদের জীবিকার উৎস নয়, পর্যটন ও সরকারি রাজস্বেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বন বিভাগের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে প্রায় ১৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা প্রায় ৬ লাখ টাকায় নেমে আসে। পর্যটনসংশ্লিষ্টরা এর পেছনে যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থাসহ বিভিন্ন কারণের কথা বলেছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এর অবস্থান। সুন্দরবনের তিনটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যকে ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। সুন্দরবন প্রশাসনিকভাবে চারটি রেঞ্জে বিভক্ত, যার মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জ সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের আওতাধীন।