ফরেনসিক পরীক্ষায় ফেনীর পরশুরামের বক্স মাহমুদে ধর্ষণের শিকার সেই কিশোরীর ভূমিষ্ট সন্তানের সঙ্গে তার আপন বড় ভাইয়ের ডিএনএর মিল পাওয়া গেছে। এই অপরাধের দায় থেকে ভাইকে বাঁচাতে ফাঁসানো হয়েছিল স্থানীয় এক মসজিদের ইমামকে। ৩২ দিন কারাভোগের পর ধর্ষণ মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে মক্তবের পাঠ শেষ করে পরশুরামের বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের কিশোরী রুবি আক্তার (১৪)। এর পাঁচ বছর পর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তানও প্রসব করে সে। আর এর দায় চাপানো হয় ওই মক্তবের শিক্ষক মোজাফফর আহমদের (২৫) কাঁধে। ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে একমাস কারাভোগের পর ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে তিনি নিরাপরাধ ছিলেন।
ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, কিশোরীর গর্ভজাত সন্তানের সঙ্গে কিশোরীর আপন বড় ভাই মোরশেদের ডিএনএ‘র মিল রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর ওই গ্রামের চান মিয়ার স্ত্রী হনুফা খাতুন তার কিশোরী কন্যা রুবি আক্তারকে (১৪) ধর্ষণের অভিযোগে একই গ্রামের স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম ও মক্তবের শিক্ষক মোজাফফরের বিরুদ্ধে পরশুরাম মডেল থানায় মামলা করেন। নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও ছাড় পাননি মোজাফফর। অভিযোগ মিথ্যা উল্লেখ করে ওই পরিবারের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর ফেনীর আদালতে মামলা করতে যান মোজাফফর। এসময় আদালত প্রাঙ্গন থেকে গ্রামের মাতব্বর ও হনুফা খাতুন তাকে জোরপূর্বক পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এরপর একমাস দুইদিন কারাভোগ করেন তিনি।
একই বছরের ২২ ডিসেম্বর অভিযুক্ত মোজাফফরকে ঢাকার মালিবাগে পুলিশের সিআইডি বিভাগের ফরেনসিক ল্যাবরেটরীতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য স্ব–শরীরে ও রুবি আক্তারের সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ঢাকার মালিবাগের ফরেনসিক ল্যাবরেটরী থেকে থেকে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি ডিএনএ প্রতিবেদন পান পরশুরাম মডেল থানার উপ–পুলিশ পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম।
ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে, পরীক্ষায় ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষের বীর্যের উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি। ভ্যাজাইনাল সোয়াবে বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত না হওয়ায় মোজাফফরের ডিএনএ প্রোফাইলের সাথে তুলনা করে মতামত প্রদান করা সম্ভব নয়। এরপর ওই কিশোরী ও তার সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া শিশু কন্যা সন্তানের জৈবিক পিতা নির্ধারণে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য তাদের পরীক্ষাগারে উপস্থিত হয়ে ডিএনএর নমুনা প্রদানের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়।
এরমধ্যে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে বিস্ময়কর তথ্য। ডিএনএ রিপোর্টে কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে মোজাফফরের ডিএনএ‘র মিল না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। কিশোরী রুবি আক্তারকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে এক পর্যায়ে ওই কিশোরী তার আপন বড় ভাই মোরশেদ তাকে গণহারে ধর্ষণ করেছে বলে স্বীকারোক্তি দেয়। ঘটনা আড়াল করে ভাইকে বাঁচাতে শিক্ষক মোজাফফরকে ফাঁসানো হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৯ মে বড় ভাই মোরশেদকে (২২) গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। আদালতে আপন বোনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে ২০ মে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী প্রদান করে মোরশেদ।
আদালতে আবেদনের প্রেক্ষিতে রুবি আক্তার ও তার ভূমিষ্ঠ সন্তান জান্নাতুল ফেরদাউস ও বড় ভাই মোরশেদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য একই বছরের ৪ আগস্ট ঢাকায় পলিশের ফরেনসিক ল্যাবরেটরীতে পাঠানো হয়। ৯ আগস্ট ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ভিকটিমের সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়ার শিশু কন্যা জান্নাতুল ফেরদাউসের সাথে মোরশেদের ডিএনএ নমুনা মিলে যাওয়ায় তিনি তার জৈবিক পিতা।
ডিএনএ পরীক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ডিএনএ পরীক্ষায় মোরশেদের সাথে জান্নাতুল ফেরদৌসের পিতা হিসেবে ৯৯.৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে। মোজাফফর আহমেদ রুবি আক্তারের গর্ভজাত সন্তানের জৈবিক পিতা নন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ–পুলিশ পরিদর্শক শরীফ হোসেন অভিযোগপত্রে মোজাফফর আহমেদের বিরুদ্ধে আনিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০০) এর ৯(১) ধারায় অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় ধর্ষণ মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আর মোরশেদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের একই ধারায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর থেকে মোরশেদ ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন।
আদালতে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট উপস্থাপনের পর এক মাস দুইদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান মোজাফফর।
পরশুরাম মডেল থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম জানান, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ গভীরভাবে তদন্ত করে। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর চার্জশীট থেকে তার নাম প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, নিরপরাধ একজনকে ফাঁসানোর জন্য চেষ্টা করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
মানসিক ও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত সেই ইমাম
পরশুরামের বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও মক্তবের শিক্ষক ছিলেন মোজাফফর আহমেদ। এ ঘটনার পর মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারান তিনি। মামলার খরচ যোগাতে বিক্রি করেছেন ৫ শতক জমি। প্রতিনিয়ত সামাজিকভাবে হেয় হয়েছেন। এসব কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ওই গ্রামের আবুল বশরের ছেলে মোজাফফর আহমেদ।
মোজাফফর আহমদ বলেন, অবশেষে সত্যের জয় হয়েছে। এ ঘটনায় আমি সামাজিক ও পারিবারিকভাবে হেনস্থার শিকার হয়েছি। মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারিয়েছি। মামলার খরচ চালাতে বাড়ির পাশে মূল্যবান জায়গা বিক্রি করে দিয়েছি, অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। কারাভোগ, সামাজিক মর্যাদাহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় প্রায় মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে ফাঁসানো হয়। প্রকৃত সত্য তুলে ধরা হলে এভাবে আমার মত অনেক নিরপরাধ মানুষ বেঁচে যাবে। ইমামের সামাজিক মর্যাদাহানী ও এক মাস কারা ক্ষতিপূরণের দাবি করেছেন।
জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের পরশুরাম উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মুফতি আমিনুল ইসলাম জানান, সুন্নী, কওমী বা সরকারি বুঝিনা, সে একজন মজলুম ইমাম ও তালেবে ইলম। ক্ষতিগ্রস্ত ইমামের ক্ষতিপূরণ কে দেবে? তাকে মানসিকভাবে সাহস দেয়ার পাশাপাশি, আর্থিক ও আইনিভাবে সহযোগিতা করা উচিত।
মোজাফফর আহমেদের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, এ ধরনের ঘটনা বিরল। তাকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষায় সত্য উদঘাটন হয়েছে।
আবদুল্লাহ আল–মামুন/এজে/দীপ্ত সংবাদ