দীর্ঘ ৪১ ঘণ্টার অপেক্ষার অবসান হলো। তবে সেই অপেক্ষার শেষে ছিল না কোনো পুনর্মিলন, ছিল প্রিয়জনদের শেষ বিদায়ের চিরস্থায়ী বেদনা। দুই প্রবাসী স্বামী দেশে ফেরার পর, স্বজনদের কান্না আর আহাজারির মধ্য দিয়ে ফেনীর ফুলগাজীতে পাশাপাশি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মা জাকিয়া আক্তার (৩৮) ও তার বড় মেয়ে ওয়াহিদা আক্তার জুহা (২০)।
সোমবার (২৯ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ফুলগাজী উপজেলার উত্তর আনন্দপুর ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। প্রবাসীদের শেষ দেখার সুবিধার্থে প্রায় ৪১ ঘণ্টা ধরে লাশবাহী ফ্রিজিং ভ্যানে সংরক্ষণ করা হয়েছিল মা-মেয়ের মরদেহ।
সরেজমিনে জানা যায়, সোমবার বেলা ১১টার দিকে ইতালি থেকে দেশে পৌঁছান নিহত মেয়ে জুহার স্বামী কাজী আজাদ হোসেন। বাড়িতে এসে স্ত্রীর নিথর দেহ দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এর আগে, রোববার রাতে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন নিহত জাকিয়া আক্তারের স্বামী নূরের সফা মজুমদার সোহেল। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর নিজ ঘরে স্ত্রীর নিথর দেহই ছিল তার প্রথম দেখা। দুই প্রবাসীর এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক প্রত্যাবর্তনে পুরো এলাকায় এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
বিকেল ৩টার দিকে ফ্রিজিং গাড়ি থেকে মরদেহ দুটি ঈদগাহ মাঠে নেওয়া হলে সেখানে উপস্থিত হাজারো মানুষের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। জানাজায় স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে মা ও মেয়েকে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়।
নিহতদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার (২৭ জুন) সকালে এক ক্যান্সার আক্রান্ত আত্মীয়কে দেখতে গিয়েছিলেন জাকিয়া আক্তার ও তার মেয়ে জুহা। রাতে বাড়ি ফেরার পথে ফেনী-বিলোনিয়া আঞ্চলিক সড়কের ফুলগাজী পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সামনে তাদের বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে একটি দ্রুতগামী পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে ফুলগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের উত্তর দৌলতপুর গ্রামের মোহাম্মদ কাউসার (৩২) ও ওয়াহিদা আক্তার জুহাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মা জাকিয়া আক্তারকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা যান। এই ঘটনায় অটোরিকশার আরও দুই যাত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন।
নিহত জাকিয়ার বড় বোন দুবাই প্রবাসী মনোয়ারা বেগম মায়া জানান, তিনিও চার দিন আগে দেশে ফিরে বোনের সঙ্গে দেখা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই এক নিমিষে ওলটপালট হয়ে গেল পুরো পরিবারটি।
এদিকে এ ঘটনায় নিহত কাউসারের বাবা আবুল কালাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা পিকআপ চালককে আসামি করে ফুলগাজী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।
ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মিজানুর রহমান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘাতক চালক ও গাড়িটি শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।