প্রকৃতির আচমকা রূপ বদলে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নেমে এসেছে দুর্যোগ। যে সময় সোনালি ধান ঘরে তোলার কথা, ঠিক তখনই টানা বৃষ্টি ও উজানের পানির চাপে পাকা বোরো ধান তলিয়ে যাচ্ছে পানির নিচে।
অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমিতে এখন শুধু পানি আর পানির ঢেউ। কৃষকের চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে সারা বছরের শ্রম আর বিনিয়োগ।
স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে হাওরের পানি দ্রুত বেড়ে যায়। এতে নিচু জমির পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান ডুবে যেতে শুরু করে। অনেক কৃষক ‘গলাডোবা’ পানিতে নেমে মরিয়া হয়ে ধান কাটার চেষ্টা করছেন, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সম্ভব হচ্ছে না।
অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর–আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুর ইউনিয়নের হাওরে অন্তত দুই হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে কৃষি বিভাগের হিসাবে এ উপজেলায় ৪৭০ হেক্টর জমির ধান নিমজ্জিত হয়েছে। পাশাপাশি হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার শিবপুর ও মাদনা এলাকায় আরও প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
মিঠামইন উপজেলার বৈরাটি ও ঢাকী ইউনিয়নের তিনটি হাওরে প্রায় ১০০ হেক্টর জমি এবং ইটনা উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ২৫৩ হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। দ্রুত পানি না নামলে এসব জমির ধান কাটা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি বিভাগের সর্বশেষ তথ্যমতে, মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলায় মোট ৯১৭ হেক্টর বোরো ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে নিকলী, বাজিতপুর, করিমগঞ্জ, সদর ও তাড়াইল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
গত সোমবার রাতের বৃষ্টিতে আগে কেটে খলায় শুকানোর জন্য রাখা ধানও রক্ষা পায়নি। খলায় জমে থাকা পানিতে কয়েক শ মেট্রিক টন ধান ডুবে গেছে বলে কৃষকেরা জানিয়েছেন।
অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাপুর হাওরের কৃষক রতন মিয়া বলেন, ১০ একর জমিতে ধান করছিলাম। ঋণ কইরা চাষ করছি। এখন সব পানির নিচে। কীভাবে ঋণ শোধ করমু, কিছুই বুঝতেছি না।
একই এলাকার কাবিল মিয়া বলেন, চোখের সামনে ধান নষ্ট অইতাছে—কইলজাডা সহ্য করতে পারতাছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী ভরাট হয়ে পানি নামার পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। খোয়াই নদীর পানি কালনী নদী দিয়ে নামতে না পারায় প্রতিবছরই এ ধরনের জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ শিকারের কারণেও পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি।
নিকলী আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত ছিল ২০ মিলিমিটার। আগামী বুধবারও মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, হাওরের পানি এখনও বিপদসীমা অতিক্রম করেনি, তবে কিছু স্থানে পানি দ্রুত বাড়ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান বলেন, ধানগাছ পাঁচ থেকে ছয় দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। এর আগে পানি নেমে গেলে কিছুটা ক্ষতি কম হতে পারে।
এদিকে চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন। আগামী ৩ মে থেকে ধান সংগ্রহ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মশিউর রহমান নাদিম/কিশোরগঞ্জ