নেপালে যেভাবে ৯০০ শিক্ষার্থীর প্রাণ বাঁচালেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

গত সপ্তাহে নেপালের ত্রিশূলী নদীর কাছে একটি স্কুলে প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থী ছিলেন। এমন সময় এক সহকর্মী ছুটে এসে প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদিকে জরুরি সতর্কবার্তা দেন।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক এএফপিকে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমার হিসাবরক্ষক স্কুলে এসে বললেন, ‘বন্যা আসছে, বন্যা আসছে।’

তখন দাওয়াদি দ্রুত সবাইকে স্কুল থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। শিক্ষকরা দ্রুত শত শত শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে নিরাপদ উঁচু জায়গায় নিয়ে যান। এর কয়েক মিনিট পরই ৪৭ বছর বয়সী দাওয়াদি দেখতে পান, ত্রিশূলী বাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি প্রবল স্রোতের মধ্যে ধসে পড়ছে।

দাওয়াদি বহু বছর ধরে এই স্কুলে দায়িত্ব পালন করছেন।

২৬ আগস্টের সেই সকালের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘তথ্যটি ভুল হলে আমাদের শুধু এক দিনের পড়াশোনা নষ্ট হতো। কিন্তু তথ্যটি সত্য হলে আমাদের জীবনই হারাতে হতো।’

দাওয়াদি জানান, শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। এমনকি এক ছাত্রী জ্ঞানও হারায়।

অন্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্কুলে আসা বাসচালকদেরও ফিরে যেতে বলা হয়। তাদের মধ্যে একজন চালক তখনই স্কুল চত্বরে ঢুকেছিলেন। তবে সময়মতো সবাইকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ায় প্রায় ৯০০ জনের প্রাণ রক্ষা পায়।

দুর্যোগের এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর নুওয়াকোট জেলার ক্ষতবিক্ষত নদীতীরের ওপর দাঁড়িয়ে দাওয়াদি নিজেকে এখন শুধু ‘একটি স্কুলবিহীন প্রধান শিক্ষক’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

নেপালচীন সীমান্ত এলাকায় হিমবাহ ও পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর বরফ, পানি ও ধ্বংসাবশেষের সুনামির মতো ঢল নেমে আসে। এতে দুই দেশে অন্তত ১ হাজার ৩৬২ জন নিহত ও ৫ হাজার ৫০০ জনের বেশি নিখোঁজ রয়েছেন।

দাওয়াদি জানান, স্কুলের বাইরে বন্যার পানিতে পাঁচ শিক্ষার্থী, এক শিক্ষক ও এক নিরাপত্তাকর্মী মারা গেছেন।

দাওয়াদি জানান, ত্রিশূলী বাজারের কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের জন্য কোনো উচ্ছেদ বা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা দেয়নি। ত্রিশূলী বাজারের কর্তৃপক্ষ লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আগাম কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি।

কয়েকজন বাসিন্দা সেতু পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রবল স্রোতে তারা ভেসে যান। অন্যরা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেন।

দাওয়াদি বলেন, ‘পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, স্কুলটি তখনও সবচেয়ে সুন্দর ভবনের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সব ধসে পড়ল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই স্কুলেই আমি পড়াশোনা করেছি। এখন কিছুই অবশিষ্ট নেই।’

১৭ বছর বয়সী সন্তোষী দোতেল তখন হিসাববিজ্ঞান ক্লাসে ছিলেন। সবাইকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ আসার পর প্রথমে তিনি পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

তিনি বলেন, ‘বন্যার পানি যে এতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে— আমরা কখনো ভাবিনি।’

প্রথমে তিনি এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে নদীর কাছে নেমে সেতু পার হয়ে পরিবারের কাছে বাড়ি পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু হঠাৎ পানির স্রোত বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘সেতুটি পানির স্রোতে ভেসে গেল। আমি কাঁদতে শুরু করলাম, কারণ মনে হচ্ছিল আমি আর কখনো বাড়ি ফিরতে পারব না এবং আমাদের করার মতো কিছুই ছিল না।’

নিচে বন্যার পানি প্রচণ্ড বেগে বয়ে যাওয়ার সময় তার বন্ধু তাকে টেনে পাহাড়ের উঁচু ঢালে তুলে নেন।

ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরও বাবামা বেঁচে আছেন কি না, তা জানতে না পারার কষ্টের কথা বলতে গিয়ে সান্তোষী কান্নায় ভেঙে পড়েন। হাতে থাকা মোবাইল ফোনটি তিনি বারবার মুঠোয় চেপে ধরছিলেন। শেষ পর্যন্ত ঘটনার চার দিন পর একটি হেলিকপ্টার তাকে পরিবারের কাছে নিয়ে যায়।

সান্তোষী বলেন, ‘হেলিকপ্টার থেকে নামতেই আমি মাকে দেখতে পেলাম। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন। তখন আমার মাথা যেন আর কাজ করছিল না।’

তার মা দুর্গা দোতেল ভেবেছিলেন মেয়েকে হয়তো আর জীবিত পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, ‘নদীর ভয়াবহ বন্যা দেখে আমি আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম যে আমার মেয়ে বেঁচে আছে।’

সেভ দ্য চিলড্রেনের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় অন্তত ৬৯টি স্কুল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১৯ হাজার শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে। দাওয়াদি বলেন, এই দুর্যোগ ২০১৫ সালে নেপালে আঘাত হানা ভূমিকম্পের চেয়েও ভয়াবহ।

তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের পর স্কুলটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা সেটি আবার তৈরি করেছিলাম।’

আবার এই স্কুলটি গড়ে তোলা দরকার। তবে তার আগে নিরাপদ জায়গায় স্কুলটি নির্মাণের ব্যবস্থা করতে হবে বলে অভিমত দেন দাওয়াদি।

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More