দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির লক্ষ্যে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘জব এক্সপো ও অ্যাডভোকেসি ইভেন্ট ২০২৬: ফ্রম স্কিলস টু অপরচুনিটিজ’।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বিসিএফসিসি) এডুকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এডুকো) ও ইকো–সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর সহযোগিতায় এবং কোরিয়ান সংস্থা চোরোগ উসান ফর চিলড্রেন–এর অর্থায়নে বাস্তবায়িত LIFT প্রকল্পের আওতায় এ আয়োজন করা হয়।
জব এক্সপোতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (TVET) নেওয়া চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের পাশাপাশি সরকারি প্রতিনিধি, TVET বিশেষজ্ঞ, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের সদস্য এবং বিভিন্ন অংশীজন অংশ নেন। প্রায় ৩১টি স্বনামধন্য চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান এতে অংশগ্রহণ করে। ফলে তরুণরা সম্ভাব্য নিয়োগদাতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, সিভি জমা, চাকরির সুযোগ সম্পর্কে ধারণা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান।
এ ছাড়া সিভি তৈরি, সাক্ষাৎকার দক্ষতা, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, মক ইন্টারভিউ এবং চাকরি অনুসন্ধান বিষয়ে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেশনের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে এডুকো বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আব্দুল হামিদ শুভেচ্ছা বক্তব্যে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে LIFT প্রকল্পের ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি ৩০০ জন সুবিধাবঞ্চিত তরুণকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সহযোগিতার জন্য নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধন্যবাদ জানান। তরুণদের নিজেদের দক্ষতার ওপর আস্থা রেখে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পরে LIFT প্রকল্পের কার্যক্রম ও অর্জন তুলে ধরেন এডুকোর চাইল্ড লেবার এলিমিনেশন ম্যানেজার আফজাল কবির খান। এ সময় প্রকল্পের ওপর ভিডিও প্রদর্শন এবং অংশগ্রহণকারী তরুণদের অভিজ্ঞতা ও সফলতার গল্প তুলে ধরা হয়।
লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন। বক্তব্যে তিনি তরুণদের জীবনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, জীবনের অর্জন শুধু বস্তুগত পুরস্কার দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। যেসব তরুণ নতুন সম্ভাবনার ক্যানভাস তৈরি করতে পারেন, তারাই ভবিষ্যতের কান্ডারি। লক্ষ্য ও পথনকশা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারলে রাষ্ট্র ও দেশ উভয়ই উপকৃত হবে।
চাকরি খোঁজার পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম তৈরিতে তরুণদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সঠিক উদ্যোক্তাদের কাছে পুঁজি পৌঁছে দেওয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এবং বাজারের পণ্য ও পরিবর্তিত চাহিদা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে NSDA-এর ভূমিকা
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (NSDA) নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী।
তিনি দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে তরুণদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে NSDA-এর ভূমিকা তুলে ধরেন। শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিকুলাম উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, সার্টিফিকেশন ও অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে প্রকৃত দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রশিক্ষণ শেষে জব প্লেসমেন্ট, সনদধারীদের মনিটরিং এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য ভাষা প্রশিক্ষণ ও অ্যাসেসমেন্টের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তরুণদের শুধু চাকরি খোঁজার পরিবর্তে নিজেদের চাকরির উপযোগী করে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে একটি কার্যকর স্কিল ইকোসিস্টেম তৈরির লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেন।
“দক্ষ যুবক, দক্ষ দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ”—স্লোগানের মাধ্যমে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।
প্রশিক্ষণ–পরবর্তী ফলোআপের ওপর গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিসিপের অতিরিক্ত সচিব ও এক্সিকিউটিভ প্রোগ্রাম ডিরেক্টর (ইপিডি) মোহাম্মদ ওয়ালিদ হোসাইন, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর (বিএনএফই) যুগ্ম সচিব ও পরিচালক (প্রশাসন) দেবব্রত চক্রবর্তী, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের (বিটিইবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন, বিজিএমইএর জেনারেল সেক্রেটারি মেজর জেনারেল (অব.) ড. শাহেদুল ইসলাম এবং ইনফরমাল সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিলের (আইএসআইএসসি) চেয়ারম্যান মির্জা নুরুল গনি শোভন।
বিসিক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ যুবসমাজ গড়ে তুলতে এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিসিকের ভূমিকা তুলে ধরেন। প্রশিক্ষণের পর কর্মীদের যথাযথ ফলোআপের ঘাটতিকে একটি দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বাজারের চাহিদার সঙ্গে দক্ষ কর্মীদের সংযোগ স্থাপন এবং প্রশিক্ষণ–পরবর্তী নিয়মিত ফলোআপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ইএসডিওর নির্বাহী পরিচালক ড. মো. শহীদ উজ জামান বক্তব্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান, দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও এডুকো বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান। বর্তমান সময়ে তরুণদের জন্য এমন কর্মসংস্থানমুখী সুযোগ তৈরির উদ্যোগকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
TVET খাত শক্তিশালীকরণে অ্যাডভোকেসি
অনুষ্ঠানের অ্যাডভোকেসি পর্বে বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (TVET) খাতের গুণগত মান, প্রাসঙ্গিকতা এবং কর্মসংস্থান ফলাফল উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এ পর্বে তরুণদের অভিজ্ঞতা বিনিময়, TVET খাত শক্তিশালীকরণে নীতিপ্রস্তাব উপস্থাপন এবং “দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়” শীর্ষক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় সরকারি প্রতিনিধি, বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
পরে অতিথিরা জব এক্সপোর বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন এবং অংশগ্রহণকারী তরুণদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
LIFT প্রকল্পে ৮৪ শতাংশ তরুণ কর্মসংস্থান বা উদ্যোক্তা কার্যক্রমে যুক্ত
LIFT (Leveraging Youth Employment in Bangladesh through Improving Their Employability and Competitiveness to Fit with the 21st-Century Job Market) প্রকল্পটি এডুকো ও ইএসডিও যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য ১৬ থেকে ২২ বছর বয়সী, বিশেষ করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা (NEET) ৩০০ তরুণ–তরুণীর কর্মসংস্থান সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
চাহিদাভিত্তিক TVET প্রশিক্ষণ, জীবন দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্তি, দক্ষতা মূল্যায়ন, কর্মসংস্থান সংযোগ, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি তরুণদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করছে।
প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে—লক্ষ্যভুক্ত ১০০ শতাংশ তরুণের ছয় মাসের TVET প্রশিক্ষণ সম্পন্ন, ৮৯ শতাংশের NSDA দক্ষতা মূল্যায়নে অংশগ্রহণ, ৭৮ শতাংশের দক্ষতা সনদ অর্জন এবং ৮৪ শতাংশ তরুণের কর্মসংস্থান বা উদ্যোক্তা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া।
এডুকো ও ইএসডিও
এডুকো একটি স্পেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও মানবিক সংস্থা। ১৯৯৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে শিশুদের শিক্ষা, সুরক্ষা ও সার্বিক উন্নয়নে সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে দেশের ১২টি জেলায় শিশুদের শিক্ষা, সুরক্ষা ও কল্যাণে স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছে সংস্থাটি।
ইকো–সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ESDO) ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি জাতীয় উন্নয়ন সংস্থা। শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, যুব কর্মসংস্থান, জীবিকা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু সহনশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ESDO-এর TVET কার্যক্রমের আওতায় দেশের ২১টি জেলায় NSDA/BTEB নিবন্ধিত ২৬টি স্কিলস ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে। এসব কেন্দ্রে বাজারের চাহিদাভিত্তিক ২৫টিরও বেশি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত ESDO এক লাখেরও বেশি তরুণ–তরুণীকে কর্মসংস্থান, আত্মকর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, ফ্রিল্যান্সিং এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করেছে।