‘এখানে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। কিছুই খেতে পারছি না। চারদিকে এত পানি যে এখনও চুলায় আগুন জ্বালিয়ে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। সবাই অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে, আর অনেকের ঘরবাড়িও ভেঙে গেছে।’
রবিবার (১২ জুলাই) এভাবে বন্যা পরিস্থিতি বর্ণনা করছিলেন কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের শাকের মোহাম্মদচর পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ হোছাইন।
কাকারা ইউনিয়নের মতোই পেকুয়া, মাতামুহুরি, রামু ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার প্রায় ৬০ শতাংশ জনপদ এখনও পানির নিচে। ডুবে আছে হাজারও ঘরবাড়ি।
পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাইছড়ি ভেলুয়াপাড়ায় ছোট একটি মাটির ঘরে এক ছেলে, ছেলে‘র বউ আর ২ নাতি নিয়ে বসবাস করছিলেন সাফুরা খাতুন।
তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি এবং বন্যার পানিতে পুরো ঘরটি ভেঙে গেছে। এক সপ্তাহ ধরে চুলায় আগুন জ্বালাতে পারছি না। প্রতিবেশীরা কয়েক বেলা খাবার পাঠালেও এখনো সরকারি কোনো সহযোগিতা আসেনি। এভাবে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটছে।’
কাকারা এলাকার বাসিন্দা ইকবাল হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিশুদ্ধ পানি ও পর্যাপ্ত শুকনো খাবার। প্রতিটি বাড়ি পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রান্নাবান্না করার কোনো সুযোগ নেই। তাই জরুরি ভিত্তিতে তাদের কাছে খাবার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।’
ইয়াছিন আরাফাত নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘চকরিয়া উপজেলাকে অবিলম্বে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা উচিত। একইসঙ্গে সরকারের সব পর্যায় থেকে জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন। উপজেলার কাকারা, লক্ষ্যারচর, কুয়ারবিলসহ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৫টি ইউনিয়নে অবিলম্বে সরকারের বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।’
কক্সবাজার জেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ। ঘরে খাবার নেই। চুলা জ্বলছে না।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, ‘বিগত বৃষ্টিপাতের রেকর্ড অনুযায়ী, জুলাই মাসে কক্সবাজারে গড়ে ৯২৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গত ৭ দিনেই জেলায় ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। অর্থাৎ, পুরো জুলাই মাসে যে পরিমাণ বৃষ্টি হওয়ার কথা, তার প্রায় ৯০ শতাংশই মাত্র সাত দিনের মধ্যে হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে না।’
জেলা প্রশাসন বলেন, অতিবৃষ্টি ও মাতামুহুরি নদী দিয়ে নেমে আসা পানির ঢল চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরি ও রামু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কক্সবাজার জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় ৬৯টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তবে স্বস্তির বিষয় হলো, শনিবার থেকে বৃষ্টিপাত অনেকটাই কমে এসেছে এবং পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ৩০ লাখ টাকা এবং ৪৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। দেওয়া হচ্ছে শুকনো খাবারও।’
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ‘স্লুইসগেট নিয়ে যে বিভ্রান্তি রয়েছে, তা সঠিক নয়। গত দুই দিন ধরে সব স্লুইসগেট খোলা রয়েছে। শুধু জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানি যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সাময়িকভাবে গেট বন্ধ করা হয়। ভাটার সময় আবার সেগুলো খুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে কোথাও কোনো স্লুইস গেট বন্ধ নেই।’
তথ্যসূত্র: সমকাল
এসএ