তীব্র গ্যাস সংকটে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী আশুগঞ্জ সার কারখানার চাকা।
টানা কারখানা বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন রোদ–বৃষ্টিতে অব্যবহৃত থেকে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের মূল্যবান যন্ত্রপাতি, অন্যদিকে দেশের সারের চাহিদা মেটাতে চড়া দামে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে ইউরিয়া। ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার শ্রাদ্ধ হচ্ছে, আর সার্বিক লোকসানের অঙ্ক ইতিমধ্যে ছাড়িয়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।
১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানাটি তিন বছর পর, অর্থাৎ ১৯৮৩ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। দৈনিক প্রায় ১,৬০০ মেট্রিক টন সার উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেবল জ্বালানি তথা গ্যাস না পাওয়ার কারণে উৎপাদন এখন পুরোপুরি শূন্যের কোঠায়।
কারখানা সূত্রে জানা যায়, প্রথম দফায় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্যাস সংকটে পড়ে বন্ধ হয়ে যায় কারখানাটির উৎপাদন। দীর্ঘ সময় পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পুনরায় যন্ত্র সচল করা সম্ভব হলেও সেই আনন্দ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৩৭ দিন। গ্যাস সরবরাহ আবার বন্ধ হয়ে গেলে থমকে যায় সব কার্যক্রম। সেই থেকে আজ অবধি কারখানার চিমনি দিয়ে আর ধোঁয়া ওঠেনি।
বাৎসরিক প্রায় চার লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে এই কারখানার, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ মেটাতে সক্ষম। এই চার লাখ টন সার দেশে উৎপাদন করতে খরচ পড়ত মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু কারখানা বন্ধ থাকায় একই পরিমাণ সার বিদেশ থেকে আমদানি করতে গিয়ে গুণতে হচ্ছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা।
বিশ্ববাজারে এলএনজির চড়া দামের কারণে প্রতি টন সারে বাড়তি খরচ হচ্ছে আরও ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। দেশের টাকা এভাবে বিদেশে ঢেলে দিয়ে দেশীয় কারখানা বসিয়ে রাখার এই পরিস্থিতিকে ক্ষোভের চোখে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কোনো ভারী কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ পড়ে থাকলে তার ভেতরের যন্ত্রাংশ আয়ু হারাতে শুরু করে। আশুগঞ্জ সার কারখানার ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। পাম্প, ভেসেল ও রোটরসহ নানা স্পর্শকাতর যন্ত্রাংশে জং ধরে ক্ষয় শুরু হয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে কারখানাটি পুনরায় চালু করতে পেট্রোবাংলার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় দ্রুতই সংকট কাটিয়ে ওঠার আশ্বাস দিচ্ছেন তারা। জ্বালানি মিললে খুব শীঘ্রই উৎপাদনে ফেরার আশা ব্যক্ত করেছেন কর্মকর্তারা।
আশুগঞ্জ সার কারখানাটি দ্রুত সচল করা গেলে তা শুধু দেশের কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহই নিশ্চিত করবে না, বরং বাঁচিয়ে দেবে রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।