বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস ২০২৬ উপলক্ষে এনভায়রনমেন্টাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (ইপিএস)-এর আয়োজনে পরিবেশ ও আলোকচিত্র বিষয়ক একটি কর্মশালা ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৪০১ নম্বর কক্ষে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে পরিবেশগত পরিবর্তনের ডকুমেন্টেশন, নগর পরিবেশ, জনসচেতনতা এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে আলোকচিত্রের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রথম পর্বে বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ‘The Backyard Battlefield: Documenting Urban Ecology and Local Resilience’ শীর্ষক কর্মশালা। কর্মশালার রিসোর্স পারসন ছিলেন স্টোরিটেলার, ফটোগ্রাফার ও ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেটর ওবায়দুল ফাত্তাহ তানভীর। কর্মশালায় নগরের পরিবেশগত বাস্তবতাকে আলোকচিত্রের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ ও নথিবদ্ধ করা; নগর জীববৈচিত্র্য, পরিবেশগত সংকট এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রকৃতি সংরক্ষণ ও অভিযোজনের গল্প তুলে ধরার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
কর্মশালার আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়—পরিবেশ আলোকচিত্রকে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক, নগরের পরিবর্তন এবং স্থানীয় পরিবেশগত বাস্তবতার দৃশ্যমান দলিল হিসেবে গড়ে তোলা। ঢাকা শহরের হারিয়ে যাওয়া জলাশয়, বায়ুদূষণ, নগর তাপদ্বীপ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সবুজ স্থান কমে যাওয়ার পাশাপাশি ছাদবাগান, নগর বৃক্ষ, নাগরিক উদ্যোগ ও স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকেও আলোকচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ‘Photography as a Tool for Environmental Awareness and Action: How Images Influence Public Perception, Policy, and Conservation Outcomes’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনভায়রনমেন্টাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির (ইপিএস) সেক্রেটারি, পরিবেশকর্মী ও আলোকচিত্রী মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ (সুমন)।
সেমিনারে আলোচনা করা হয় যে, একটি শক্তিশালী পরিবেশ আলোকচিত্র মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে, আবেগ ও সহমর্মিতা তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন তোলা ও অংশগ্রহণের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এভাবে ছবি থেকে সচেতনতা, সচেতনতা থেকে জনসম্পৃক্ততা, জনসম্পৃক্ততা থেকে অ্যাডভোকেসি এবং সেখান থেকে নীতি বা সংরক্ষণ উদ্যোগে প্রভাব তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেমিনারে সুন্দরবন, নদী, হাওর, উপকূল এবং নগর পরিবেশকে পরিবেশ আলোকচিত্র চর্চার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিশেষভাবে ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ, জলাশয় হারিয়ে যাওয়া, নগর তাপদ্বীপ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর জীববৈচিত্র্য ও সবুজ স্থান সংকোচনের পাশাপাশি ছাদবাগান, কমিউনিটি গার্ডেন, পুরোনো বৃক্ষ এবং নাগরিক পরিবেশ উদ্যোগের মতো ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো নথিবদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেমিনারে আরও গুরুত্ব পায় ‘সমস্যার পাশাপাশি সমাধানের গল্প’ তুলে ধরার বিষয়টি। শুধু পরিবেশ ধ্বংসের ছবি নয়; বরং পুনরুদ্ধার, অভিযোজন, স্থানীয় মানুষের উদ্যোগ এবং সম্ভাবনার গল্পও আলোকচিত্রে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। ভবিষ্যতের পরিবেশ আলোকচিত্রকে একই সঙ্গে সমস্যামুখী ও সমাধানমুখী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সেমিনারে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন: ফটোগ্রাফার, গবেষক এবং দৈনিক দেশ রূপান্তরের ফটোগ্রাফি সম্পাদক শাহাদাত পারভেজ; ফটোগ্রাফার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিক্ষাবিদ এবং ত্রৈমাসিক দৃশ্যকাল পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক কে এম জাহাঙ্গীর আলম; লেখক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সামাজিক আন্দোলনকর্মী এবং ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের সংগঠক শুভ কিবরিয়া; এবং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ নীতি বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম। আলোচনা সঞ্চালনা করেন এনভায়রনমেন্টাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির (ইপিএস) প্রেসিডেন্ট মো. কাওসার হাবিব (সোমেল)।
আলোচনায় আলোকচিত্রকে পরিবেশগত তথ্য ও মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি কার্যকর সেতু হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা, পরিবেশগত পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ভিজ্যুয়াল নথি তৈরির প্রয়োজনীয়তা এবং আলোকচিত্রী, গবেষক, গণমাধ্যম, পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের পরিবেশ আলোকচিত্র চর্চাকে আরও সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি আলোকচিত্র প্রকল্প, বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের ভিজ্যুয়াল আর্কাইভ, তরুণ আলোকচিত্রীদের প্রশিক্ষণ এবং পরিবেশ শিক্ষা কার্যক্রমে আলোকচিত্রের ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।