বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হলেও সংসদীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোতে তার পদটি মূলত মর্যাদাপূর্ণ ও আলংকারিক। দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কার্যাবলি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল নির্বাহী কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির নামে গৃহীত হলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাকে মূলত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হয়।
সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে, কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয় ছাড়া বাকি সকল দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হবে। এর অর্থ হলো, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা মাত্র দুটি। তিনি জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের আস্থাভাজন সংসদ সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন এবং দেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি তিনি একাই গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও সংসদীয় কার্যক্রমে রাষ্ট্রপতির গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক ভূমিকা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শে তিনি জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেন, স্থগিত করেন এবং প্রয়োজনে সংসদ ভেঙে দিতে পারেন। সংসদে পাস হওয়া কোনো বিল আইনে পরিণত হতে রাষ্ট্রপতির সম্মতি অপরিহার্য। অর্থ বিল ছাড়া অন্য যেকোনো বিল তিনি চাইলে পুনর্বিবেচনার জন্য সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন। তবে সংসদ যদি বিলটি পুনরায় পাস করে, তবে রাষ্ট্রপতি তাতে সম্মতি দিতে বাধ্য থাকেন। এছাড়া সংসদ অধিবেশন না চলাকালীন সময়ে জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন, যা পরবর্তীতে সংসদে অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়।
নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির আওতা বেশ বিস্তৃত। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে মন্ত্রিসভার সদস্য, অ্যাটর্নি জেনারেল, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রককে নিয়োগ দেন। সামরিক দিক থেকে সংবিধানের ৬১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। পাশাপাশি পদাধিকার বলে তিনি দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বা চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাষ্ট্রপতির অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি সাংবিধানিক অধিকার হলো ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তিনি কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের দেওয়া যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করতে পারেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির প্রাণভিক্ষার চূড়ান্ত আবেদনটিও তিনিই বিবেচনা করেন। এছাড়া, আইনি সুরক্ষার অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে দেশের কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যায় না।