ইসলামে বিয়ে নারী–পুরুষের মাঝে বৈধ ও পবিত্র সম্পর্ক স্থাপনের অন্যতম মাধ্যম। এটি শুধু সামাজিক বন্ধন নয়, বরং দ্বীনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘যে ব্যক্তি বিয়ে করল, সে তার অর্ধেক ইমান (দ্বীন) পূর্ণ করে ফেলল। অতএব, বাকি অর্ধেকাংশে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।’ (বায়হাকি, শুআবুল ইমান)
ফিকহে হানাফি অনুযায়ী, বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার জন্য ‘ইজাব’ (প্রস্তাব) এবং ‘কবুল’ (গ্রহণ) অপরিহার্য। তবে শুধু ‘কবুল’ শব্দ উচ্চারণ করলেই নিকাহ হবে—বিষয়টি এমন নয়।
প্রস্তাব গ্রহণের অর্থ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে এমন আরও কিছু শব্দ ও বাক্যের মাধ্যমেও নিকাহ শুদ্ধভাবে সম্পন্ন হতে পারে।
বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার মৌলিক শর্তসমূহ হলো—
১. ইজাব। পক্ষবিশেষের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রস্তাব।
২. কবুল। অপর পক্ষের সম্মতিসূচক জবাব।
৩. স্পষ্ট বাক্য। এমন শব্দ ব্যবহার করতে হবে যার মাধ্যমে নিকাহ বোঝা যায়।
৪. সাক্ষী। দুজন পুরুষ অথবা এক পুরুষ ও দুই নারী সাক্ষীর উপস্থিতি।
‘কবুল’ না বলেও যেসব শব্দে নিকাহ সম্পন্ন হয়
১. قَبِلْتُ (ক্ববিলতু)
অর্থ: ‘আমি গ্রহণ করলাম।’ ইজাবের জবাবে বর বা কনে যদি ‘قَبِلْتُ’ বলে, তাহলে সেটি পূর্ণাঙ্গ কবুল হিসেবে গণ্য হবে।
২. رَضِيتُ (রদ্বিতু)
অর্থ: ‘আমি রাজি হলাম’ বা ‘আমি সন্তুষ্ট হলাম।’ ইজাবের পর এই শব্দ ব্যবহার করলেও তা সম্মতির প্রকাশ হিসেবে গণ্য হবে এবং নিকাহ শুদ্ধ হবে।
৩. تَزَوَّجْتُهَا (তাজাওয়াজ্জাতুহা)
অর্থ: ‘আমি তাকে বিবাহ করলাম।’ বর যদি এভাবে নিজের সম্মতি প্রকাশ করেন, তাহলে সেটিও নিকাহের সুস্পষ্ট গ্রহণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
৪. أَنْكَحْتُ نَفْسِي إِيَّاهُ (আনকাহতু নাফসি ইয়্যাহু)
অর্থ: ‘আমি নিজেকে তার সঙ্গে বিবাহ করলাম।’ এই বাক্যও নিকাহ গ্রহণের স্পষ্ট অর্থ বহন করে।
৫. أَجَزْتُهُ (আজাযতুহু)
অর্থ: ‘আমি এটি অনুমোদন করলাম।’ প্রতিনিধি বা ওকিলের মাধ্যমে ইজাব সম্পন্ন হওয়ার পর মূল ব্যক্তি যদি এভাবে অনুমোদন দেন, তাহলে নিকাহ সহিহ হবে।
ফিকহি কিতাবসমূহ থেকে দলিল
১. الفتاوى الهندية (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া)
ويجوز النكاح بألفاظ هي صريحة في النكاح، كأنكحت، وتزوجت، وقبلت، ورضيت، ونحوها
বাংলা অর্থ: নিকাহ এমন সব স্পষ্ট শব্দের মাধ্যমে জায়েয হয়, যেমন أنكحتُ، تزوجتُ، قبلتُ، رضيتُ ইত্যাদি।
২. الهداية (আল–হেদায়া)
ويعتبر الإيجاب والقبول بلفظ يدل عليه صريحاً
অর্থ: ইজাব ও কবুল এমন শব্দে হতে হবে, যা দ্বারা স্পষ্টভাবে নিকাহের অর্থ প্রকাশ পায়।
৩. الدر المختار مع رد المحتار (আদ–দুররুল মুখতার মাআ রদ্দুল মুহতার/ফতোয়ায়ে শামী)
ويصح النكاح بكل لفظ صريح يدل على التمليك في الحال، كزوجتك، أنكحتك، وتزوجت ونحوها
অর্থ: বর্তমান অবস্থায় মালিকানা (বৈবাহিক সম্পর্ক) প্রতিষ্ঠার অর্থ প্রকাশ করে—এমন প্রত্যেকটি স্পষ্ট শব্দ দ্বারা নিকাহ সহিহ হয়। যেমন زوجتك، أنكحتك، تزوجت এবং এ ধরনের অন্যান্য শব্দ।
কোরআন থেকে দৃষ্টান্ত—
فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ
অর্থ, ভদ্রভাবে স্ত্রীর সঙ্গে জীবন যাপন করো, কিংবা সম্মানের সঙ্গে তাকে বিদায় দাও। (সূরা বাকারা, ২:২২৯)
এখানে “إِمْسَاكٌ” দ্বারা দাম্পত্য জীবনে সম্মতি ও স্বীকৃতির বিষয়টি প্রকাশ পায়, যা কবুলের মর্ম বোঝায়।
হাদিস থেকে দলিল—
النكاح عن تراض
অর্থ: নিকাহ পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়। (সুনান ইবনু মাজাহ)
এই হাদিস থেকে বুঝা যায়, সরাসরি ‘কবুল‘ শব্দ ছাড়াও সম্মতির প্রকাশ থাকলে এবং প্রেক্ষাপট পরিষ্কার হলে বিয়ে হয়ে যাবে।
ফিকহে হানাফি মতে, ‘কবুল’ শব্দটি ছাড়া অন্য শব্দ বা বাক্য দিয়ে যদি সম্মতির প্রকাশ ঘটে এবং তা স্পষ্টভাবে নিকাহের অর্থ প্রকাশ করে, তাহলে সেই নিকাহ বৈধ ও সহীহ। তবে এসব ক্ষেত্রে সাক্ষী, সঠিক প্রেক্ষাপট, এবং বক্তব্যের স্পষ্টতা অপরিহার্য।
তবে শরিয়ত দৃষ্টিতে বিকল্প শব্দে নিকাহ (বিবাহ) করার সুযোগ থাকলেও, ভবিষ্যতে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা বিরোধ এড়াতে ‘আমি কবুল করলাম‘ শব্দ বলেই নিকাহ সম্পন্ন করা উত্তম।
এসএ