দূষণে মৃতপ্রায় শীতলক্ষ্যা, লবণাক্ততায় বিপন্ন দক্ষিণের কৃষি

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক
নদী দখল ও দূষণের কারণে প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা নদীর পানি এখন কুচকুচে কালো।

আগামী ২৮ জুলাই বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস। প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা এবং দূষণ রোধে সচেতনতা বাড়াতে দিনটি পালিত হলেও বাংলাদেশের প্রাণপ্রকৃতির বর্তমান চিত্র চরম উদ্বেগজনক।

অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণে দেশের নদনদীর জলজ পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলে বাড়ছে লবণাক্ততা, যা তীব্র করে তুলছে সুপেয় পানির সংকট এবং হুমকিতে ফেলছে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে।

নদী দখল ও দূষণের কারণে প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা নদীর পানি এখন কুচকুচে কালো। বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য টিকে থাকার জন্য ন্যূনতম ৪.৫ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকা প্রয়োজন। কিন্তু শীতলক্ষ্যার পানিতে বর্তমানে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্র ০.১ মিলিগ্রাম। প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি লিটার শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি এই নদীতে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে হোটেলরেস্তোরাঁ ও বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্য, পলিথিন এবং নৌযানের আবর্জনা। পাশাপাশি চলছে অব্যাহত নদী দখলের মহোৎসব।স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, “ছোটবেলায় যখন দেখতাম, তখন পানি খুব ভালো ছিল। এখন বিভিন্ন বর্জ্য পড়ার কারণে নদীর পানি দূষিত হয়ে ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে গেছে।

পরিবেশবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, নদীদূষণ রোধে দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি (নারায়ণগঞ্জ শাখা) মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, নদীর তীরবর্তী শিল্পকারখানাগুলোর জন্য বিচ্ছিন্ন ইটিপির (ETP) বদলে সেন্ট্রাল ইটিপি বা কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে নদীর ওপর দূষণের এই ভয়াবহ প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

নদীদূষণের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে দেশের দক্ষিণের জনপদ বরগুনায় লবণাক্ততা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা লোনা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ও মাটির উর্বরতা কমছে, মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ। সেচের জন্য খালবিলে পর্যাপ্ত মিষ্টি পানি মিলছে না, তীব্র আকার ধারণ করেছে সুপেয় পানির সংকট।

লবণাক্ততা ও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে দিশেহারা স্থানীয় কৃষকরা। এক কৃষক তার চরম হতাশার কথা জানিয়ে বলেন, “বাপদাদার আমল থেকে দেখে আসছি জমিতে তিনবার ফসল হতো, কৃষির খরচ উঠতো, বদলার (শ্রমিক) পয়সা হতো। এখন এই লবণাক্ত পানিতে আমাদের কৃষি হয় না। দুই সিজনের এক সিজনে খরা আর এক সিজনে বৃষ্টি হওয়ার কথা। কিন্তু খরার সময় দেখা যায় বৃষ্টি হচ্ছে, আর অসময়ের সেই বৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

প্রকৃতি ও পরিবেশের এই বহুমুখী বিপর্যয়ের দ্রুত সমাধান না হলে আগামীতে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবসের প্রাক্কালে তাই পরিবেশ রক্ষায় এখনই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন তারা। 

 

মাসউদ/এসএ

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More