বৃহস্পতিবার, ৯ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
UPCOMING

FIXTURES

FIFA 2026 24H Window
MATCH -- ROUND -
- - -
VS
- - -
KICK OFF:
Processing...
বৃহস্পতিবার, ৯ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জামদানি থেকে বেনারসি: কোন শাড়ির উৎপত্তি কোথায়, বৈশিষ্ট্য কী?

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

শাড়ি শুধু এক খণ্ড কাপড় নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আভিজাত্য ও শত বছরের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। যুগ যুগ ধরে বুননশৈলী, সুতার ব্যবহার এবং নকশার ওপর ভিত্তি করে শাড়িতে এসেছে অভাবনীয় বৈচিত্র্য। ভৌগোলিক অবস্থান ও সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে অঞ্চলভেদে শাড়ির নাম, ধরন ও বৈশিষ্ট্যেও রয়েছে বিস্তর তফাৎ। উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী কিছু শাড়ির উৎপত্তি ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।

জামদানি

বাংলাদেশের শাড়ির কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে জামদানির নাম। মূলত ঢাকার রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁও অঞ্চলে এর উৎপত্তি। মসলিনের ওপর ভিত্তি করে বোনা জামদানি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। সম্পূর্ণ হাতে বোনা এই শাড়ির মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর সূক্ষ্ম জ্যামিতিক ও ফুললতাপাতার নকশা। ওজনে অত্যন্ত হালকা এবং আরামদায়ক হওয়ায় যেকোনো উৎসবে এটি নারীদের প্রথম পছন্দ। এর অনন্য বয়নশৈলীর কারণে ইউনেস্কো জামদানিকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

তাঁতের শাড়ি

দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হলো সুতির সুতোয় বোনা তাঁতের শাড়ি। বাংলাদেশ, বিশেষ করে টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এই শাড়ির মূল উৎপত্তি। এই শাড়ির পাড়গুলো সাধারণত চওড়া হয় এবং জমিনে হালকা সুতোর কাজ থাকে। সুতি কাপড়ের তৈরি বলে গরমে পরার জন্য এটি অত্যন্ত আরামদায়ক একটি শাড়ি।

রাজশাহী সিল্ক

আভিজাত্যের প্রতীক রাজশাহী সিল্ক শাড়ির উৎপত্তি বাংলাদেশের রাজশাহীতে। এখানকার রেশম পোকা থেকে উৎপাদিত সুতা দিয়ে তৈরি হয় এই বিশেষ শাড়ি। অত্যন্ত নরম, মসৃণ ও উজ্জ্বল জমিনের কারণে এই শাড়ি বেশ জনপ্রিয়। এর বুনন এতই মিহি যে এটি পরলে খুব সহজেই শরীরের সাথে মানিয়ে যায় এবং আভিজাত্য প্রকাশ করে।

মণিপুরী

সিলেট অঞ্চলের মণিপুরী সম্প্রদায়ের হাতে তৈরি মণিপুরী শাড়ি তার নিজস্বতায় ভাস্বর। গাঢ় ও উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার এবং বিশেষ ধরনের উপজাতীয় মোটিফ এই শাড়ির প্রধান বৈশিষ্ট্য। সাধারণত এর পাড়ে ত্রিভুজাকৃতির টেম্পল মোটিফ বা মন্দিরের নকশা থাকে। সুতি ও সিল্ক উভয় সুতাতেই এটি নিপুণভাবে বোনা হয়।

বেনারসি

উপমহাদেশের বিয়ের কনে মানেই যেন বেনারসি শাড়ি। ভারতের উত্তর প্রদেশের বারাণসী বা কাশীতে এর উৎপত্তি। খাঁটি সিল্কের ওপর সোনা ও রুপার জরি সুতোর ভারী কাজের জন্য বেনারসি বিখ্যাত। এতে সাধারণত মুঘল আমলের ফুল, পাতা, কলকা ও জ্যামিতিক নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়, যা একে করে তোলে বেশ ভারী এবং রাজকীয়।

কাঞ্জিভরম

ভারতের তামিলনাড়ুর কাঞ্চিপুরমে তৈরি কাঞ্জিভরম শাড়িকে দক্ষিণ ভারতের বেনারসিবলা হয়ে থাকে। মালবেরি সিল্ক ও খাঁটি জরি দিয়ে তৈরি এই শাড়ির জমিন এবং পাড়ের রঙের মধ্যে সাধারণত তীব্র বৈসাদৃশ্য থাকে। শাড়ির পাড়ে মন্দির, ময়ূর, পদ্ম বা পৌরাণিক কাহিনীর দৃশ্য বোনা থাকে, যা দেখতে অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং শাড়িটিও বেশ টেকসই হয়।

বালুচরী

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও বিষ্ণুপুরে তৈরি বালুচরী শাড়ির প্রধান আকর্ষণ হলো এর জমকালো আঁচল। এই শাড়ির আঁচলজুড়ে রামায়ণ, মহাভারত বা নবাবী আমলের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক দৃশ্য রেশম সুতো দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়। এটি মূলত সিল্কের ওপর অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বোনা হয়।

চান্দেরি

ভারতের মধ্যপ্রদেশে উৎপাদিত চান্দেরি শাড়ি তৈরি হয় সিল্ক ও সুতির সুনিপুণ মিশ্রণে। এটি অত্যন্ত হালকা এবং প্রায় স্বচ্ছ হয়ে থাকে। এতে সোনা বা রুপার জরির সূক্ষ্ম কাজ থাকে। আভিজাত্য এবং স্নিগ্ধতার কারণে গ্রীষ্মকালীন উৎসবগুলোতে এই শাড়ির কদর রয়েছে।

বাঁধনি বা টাইডাই

ভারতের গুজরাট ও রাজস্থান অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি হলো বাঁধনি। ‘বাঁধনি’ শব্দটি এসেছে ‘বাঁধা’ থেকে। কাপড়কে সুতো দিয়ে ছোট ছোট অংশে বেঁধে রংয়ে ডুবিয়ে এই শাড়ির নকশা তৈরি করা হয়। এর ফলে পুরো শাড়িতে ছোট ছোট বিন্দু বা জ্যামিতিক নকশা ফুটে ওঠে। এটি সাধারণত লাল, হলুদ, সবুজের মতো খুব উজ্জ্বল রঙের হয়ে থাকে।

পটোলা

ভারতের গুজরাটের পাটান অঞ্চলে উৎপাদিত পটোলা এক বিশেষ ধরনের সিল্ক শাড়ি। এটি ডাবল ইক্কত পদ্ধতিতে তৈরি হয়। বোনার আগেই সুতোতে নকশা অনুযায়ী নিখুঁতভাবে রং করা হয়। শাড়ির দুই পিঠেই একই নকশা থাকে এবং এটি এতই নিখুঁত যে তৈরি করতে কারিগরদের কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

শাড়ির এই বিশাল বৈচিত্র্য প্রমাণ করে যে, এটি কেবল একটি সাধারণ পোশাক নয়, বরং বয়নশিল্পীদের শত শত ঘণ্টার শ্রম, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার এক অপূর্ব শিল্পকর্ম। আধুনিক যুগের পশ্চিমা পোশাকের ভিড়েও শাড়ি তার নিজস্ব জৌলুস ও আবেদন ধরে রেখেছে। উৎসবে বা দৈনন্দিন জীবনে, শাড়ি সবসময়ই বাঙালি তথা দক্ষিণ এশীয় নারীদের প্রথম ও অকৃত্রিম ভালোবাসা।

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More