ক্যালেন্ডারের পাতায় আষাঢ়ের শেষভাগ। আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর ভারতের ত্রিপুরা থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে ফেনীর তিন নদী–মুহুরী, কহুয়া আর সিলোনীয়ায় এখন প্রলয়নাচন। প্রতি বছর এই তিন নদী তীরবর্তী মানুষের বুকে যে আতঙ্কের ক্ষত তৈরি হয়, তা যেন আরও একবার তাজা হয়ে উঠেছে। ক্রমাগত বাড়তে থাকা পানির তোড়ে রাত পোহালেই তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় এখন নির্ঘুম রাত কাটছে পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার নদীপাড়ের লাখো মানুষের। তাদের চোখ এখন ত্রাসের কারণ হয়ে ওঠা বেড়িবাঁধের দুর্বল পয়েন্টগুলোতে।
জেলা আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, আজ ৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) সকাল ৯টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। জেলা আবহাওয়া কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই বৃষ্টিপাত আরও কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে।
আকাশের এই কান্নার সাথে যোগ হয়েছে উজানের ঢল। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, আজ সকাল ৯টায় পরশুরাম পয়েন্টে মুহুরী নদীর পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৬৬ মিটার–যা মাত্র সাত ঘণ্টা আগে, অর্থাৎ রাত ১২টায় ছিল ১০ দশমিক ৪০ মিটার। যদিও এখানকার বিপদসীমা ১২ দশমিক ৫৫ মিটার, তবে পানি যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তাতে বিপদসীমা ছোঁয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এক দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। প্রতি বছরই এই নদীগুলোর বাঁধ ভেঙে মুহূর্তের মধ্যে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় গোয়ালের গবাদিপশু, কৃষকের বুকভরা আশার আমনের বীজতলা আর মৎস্য চাষীদের স্বপ্নের ঘের।
ফুলগাজীর বাসিন্দা সাহাব উদ্দিন উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলেন, সবচেয়ে ভয় লাগে গভীর রাত নিয়ে। কখন যে বাঁধ ভেঙে ঘরের ভেতর পানি চলে আসে, সেই আতঙ্কে চোখের পাতা এক করতে পারছি না।
এদিকে সম্ভাব্য এই দুর্যোগ ঠেকাতে ও জানমাল রক্ষায় নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। গত মঙ্গলবার বিকেলে ফেনী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পরিস্থিতি সম্পর্কে ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ত্রিপুরায় ভারী বর্ষণের কারণে আমাদের নদীগুলোর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। আমরা সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছি। সরকারি কর্মকর্তা, মেডিকেল টিম ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। একই সাথে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিষ্কার করা ও শুকনো খাবার মজুত রাখার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ফেনী পাউবো–এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তারা সার্বক্ষণিকভাবে নদীর বাঁধ ও পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে জরুরি মেরামতের প্রস্তুতি রাখছেন।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে ফেনীর উত্তরাঞ্চলের মানুষ এখন এক বুক আশঙ্কা আর প্রার্থনা নিয়ে অপেক্ষা করছে–মেঘ কাটুক, শান্ত হোক মুহুরী–কহুয়া–সিলোনীয়া।
আবদুল্লাহ আল–মামুন/এজে/দীপ্ত সংবাদ