কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসতেই বাগেরহাটের হাট–বাজারে বেড়েছে ঐতিহ্যবাহী মসলা চুইঝালের চাহিদা। গরুর মাংসের স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়াতে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে চুইঝাল যেন এক অপরিহার্য উপাদান। বাড়তি চাহিদার কারণে বাজারে বেড়েছে বেচাকেনা, পাশাপাশি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে দামও। সাধারণ সময়ে বাগেরহাটের বিভিন্ন হাট–বাজারে আকারভেদে প্রতি কেজি চুইঝাল ৪০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ১৪০০ টাকা পর্যন্ত।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার ফকিরহাট, চিতলমারী, মোল্লাহাট ও সদরসহ বিভিন্ন বাজারের চুইঝালের দোকানগুলোতে এখন ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। শুধু স্থানীয় ক্রেতাই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরাও ভিড় করছেন দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এ মসলার বাজারে। কোরবানির মাংস রান্নায় বাড়তি স্বাদ ও ঝাঁজ যোগ করতে চুইঝালের জুড়ি নেই। সুগন্ধি ও ঝাঁজালো স্বাদের কারণে যেকোনো মাংসের রান্নায় এটি এনে দেয় ভিন্ন মাত্রা। ফলে ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরের মতো এবারও কয়েকগুণ বেড়েছে চুইঝালের চাহিদা।
ফকিরহাট বাজারের চুইঝাল ব্যবসায়ী মামুন শেখ বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদ সামনে রেখে চুইঝালের বাজারে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কিছুটা কম থাকায় দামও বেড়েছে। আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি চুইঝাল ৮০০ থেকে ১৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু বাগেরহাট নয়, পার্শ্ববর্তী জেলা খুলনা, পিরোজপুর, নড়াইল, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও খুচরা ব্যবসায়ীরা ফকিরহাট বাজারে চুইঝাল কিনতে আসছেন। ফলে কেনাবেচাও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
গোপালগঞ্জের চুইঝাল ব্যবসায়ী শেখ আকবর আলী বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে গোপালগঞ্জ পৌর মার্কেটে চুইঝালের ব্যবসা করছি। বাগেরহাটের ফকিরহাট বাজার থেকে পাইকারি দামে চুইঝাল সংগ্রহ করে খুচরা বাজারে বিক্রি করি। বাগেরহাটের চুইঝালের চাহিদা বেশি, কারণ এখানকার চুইঝালের স্বাদ অনেক ভালো।
বাগেরহাট সদর উপজেলার যাত্রাপুর বাজারের চুইঝাল বিক্রেতা মো. শুকুর শেখ বলেন, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বাজারে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী আমরা খুচরা ক্রেতাদের চুইঝাল দিতে পারছি না। কারণ পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। এ কারণে দামও কিছুটা বেড়েছে।
বরিশাল থেকে ফকিরহাট বাজারে চুইঝাল কিনতে আসা ক্রেতা কালাম শেখ বলেন, সামনে কোরবানির ঈদ, তাই বরিশাল থেকে চুইঝাল কিনতে এসেছি। বাগেরহাটের চুইঝালের ঝাঁজ ও স্বাদ অনেক ভালো। এটি মাংসের স্বাদ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া গ্যাসের সমস্যা, কাশি ও বাতের ব্যথাসহ নানা উপকারেও চুইঝাল ব্যবহৃত হয়।
ফকিরহাট বাজারে চুইঝাল কিনতে আসা সোহেল শেখ বলেন, আমরা বাগেরহাটের মানুষ, তাই চুইঝাল আমাদের কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি মসলা। বাগেরহাটের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মাংস রান্নায় চুইঝাল ব্যবহার করা হয়। এটি খাবারের স্বাদ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। শুধু চুইঝালকে কেন্দ্র করেই বাগেরহাট ও খুলনায় অনেক হোটেল গড়ে উঠেছে, যেখানে শুধু চুইঝালের গরুর মাংস বিক্রি করা হয়।
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, চুইঝাল একটি ঔষধিগুণ সম্পন্ন মসলা। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা, গ্যাসের সমস্যা কমানো, রুচি বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এছাড়া রান্নার স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়াতেও এর জুড়ি নেই।
তিনি আরও জানান, এ বছর বাগেরহাট জেলায় ৩২ হেক্টর জমিতে চুইঝালের আবাদ হয়েছে। সেখান থেকে প্রায় ৬৮ মেট্রিক টন চুইঝাল উৎপাদন হয়েছে। চাষিদের আগ্রহ বাড়াতে কৃষি বিভাগ চারা বিতরণসহ বিভিন্ন পরামর্শ ও সহায়তা দিচ্ছে।