ইউরোপের রাস্তায় নজরকাড়া বৈদ্যুতিক যানবাহন থেকে শুরু করে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া জুড়ে বাবল টি’র দোকানের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিশ্বজুড়ে সংগ্রহের উন্মাদনা সৃষ্টিকারী অদ্ভুত সুন্দর খেলনা পর্যন্ত—চীনা ব্র্যান্ডগুলো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং উদ্ভাবন, নকশা ও গুণমানের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এপ্রিলে ব্রাজিলের সাও পাওলোতে যখন মিশুয়ে আইসক্রিম অ্যান্ড টি তাদের প্রথম দোকান খোলে, তখন কৌতূহলী গ্রাহকদের ভিড় জমে যায় দোকানের বাইরে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে প্রথমবারের মতো এই জনপ্রিয় চীনা পানীয়টি চেখে দেখার কষ্ট স্বীকার করেন অনেক গ্রাহক। সাও পাওলোর এই আত্মপ্রকাশটি ছিল মিশুয়ের বৈদেশিক সম্প্রসারণের সর্বশেষ পদক্ষেপ। ২০১৮ সালে ভিয়েতনামের হ্যানয়ে তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক আউটলেট চালু করার পর থেকে, এই চেইনটি চীনের বাইরে ৪ হাজারের বেশি দোকানে সম্প্রসারিত হয়েছে।
মিশুয়ে ক্রমবর্ধমান সেইসব চীনা ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেটি তার বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণকে ত্বরান্বিত করছে এবং মানসম্মত পণ্য, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং স্থানীয় পণ্যের মাধ্যমে বিদেশি ভোক্তাদের মন জয় করছে।
ক্রীড়াপণ্যের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান আন্তা ফেব্রুয়ারিতে ক্যালিফোর্নিয়ার বেভারলি হিলসে তাদের প্রথম উত্তর আমেরিকান ফ্ল্যাগশিপ স্টোর খুলেছে। হাইতিলাও–এর নেতৃত্বে হটপট চেইনগুলো অনেক দেশে একনিষ্ঠ গ্রাহক তৈরি করেছে, অন্যদিকে ইয়াতিয়া’র ইলেকট্রিক বাইক ও মোটরসাইকেল দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকায় ভালো বাজার পেয়েছে।
পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ইপসোস–এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, চীনা ব্র্যান্ডগুলোর প্রতি বিশ্বব্যাপী আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাদের আন্তর্জাতিক প্রভাব ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে।
হ্যনান সমাজ বিজ্ঞান একাডেমির গবেষক চাও চিসান বলেন, “তারা বিশ্বব্যাপী তরুণ ভোক্তাদের পছন্দের উপর বিশেষভাবে নজর দিয়েছে। পণ্যের নকশা, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা এবং বিপণন মডেলে ক্রমাগত উদ্ভাবন জেনারেশন জেড–এর ব্যক্তিগতকৃত এবং ট্রেন্ড–চালিত ভোগের পছন্দের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।“
পপ মার্টের লাবুবু একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ব্র্যান্ডটির ‘দ্য মনস্টারস‘ সিরিজের এই চরিত্রটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, এবং ২০২৫ সাল নাগাদ এর আয় ১৪.১৬ বিলিয়ন ইউয়ানে (প্রায় ২.০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় তিনগুণেরও বেশি। গত বছর পপ মার্ট বার্লিন, রোম, কোপেনহেগেন এবং টরন্টোসহ ৩০টিরও বেশি বিদেশি শহরে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে।
এই বাণিজ্যিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে চীনের শিল্পশক্তির ভিত্তি। সিয়ামেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ সহযোগী অধ্যাপক লি খাই বলেন, “চীনের সম্পূর্ণ উৎপাদন ব্যবস্থা, বিশেষ করে এর সরবরাহ শৃঙ্খলের সমন্বয় এবং বিশালতা, কোম্পানিগুলোকে ডিজাইন ও উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য পুনঃসংগ্রহ ও সরবরাহ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিকে সংক্ষিপ্ত করতে সাহায্য করে।“
লি আরও বলেন, “বিদেশি গ্রাহকদের জন্য এর অর্থ হলো একই মূল্যে আরও আধুনিক, নির্ভরযোগ্য এবং দ্রুত আপডেট হওয়া পণ্য ও পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ।“
পণ্যের বাইরেও, চীনা ব্র্যান্ডগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে জীবনধারা এবং অভিজ্ঞতাকেও অন্তর্ভুক্ত করছে।
হেইটি এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কাছে অবস্থিত এর লন্ডন স্টোরটি একটি অপূর্ব চীনা নান্দনিক স্থান হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছে, যেখানে রয়েছে ইন্টারেক্টিভ সিলিং স্ক্রিন, রক গার্ডেন ডিসপ্লে এবং ঐতিহ্যবাহী ইঙ্ক–আর্ট অনুপ্রাণিত বসার ব্যবস্থা। অন্যদিকে, এর টরন্টো শাখায় একটি ’চা গবেষণাগার’ রয়েছে, যেখানে গ্রাহকরা কাঁচা উপকরণ থেকে চা পানীয় তৈরির প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
লি বলেন, “হট পট এখন ঝোলের চেয়ে সামাজিক অভিজ্ঞতার জন্য বেশি পরিচিত। মিল্ক টি এখন পানীয়ের চেয়ে এর নান্দনিকতা, স্বাদ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার আকর্ষণের জন্য বেশি পরিচিত। আর স্পোর্টসওয়্যার এখন আর শুধু পোশাক নয়, বরং ডিজাইন, প্রযুক্তি এবং জীবনযাত্রার প্রতিফলন।”
তিনি আরও বলেন, “বিদেশের গ্রাহকরা ক্রমশ অভিজ্ঞতা এবং আত্মপরিচয় কিনছেন।“
চেংচৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক ওয়াং ওয়েইছিয়াং বলেন, চীনের ক্রমবর্ধমান উদ্ভাবনী ক্ষমতা, বাজারের প্রাণশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান সাংস্কৃতিক আকর্ষণ চালিত হয়ে চীনা ব্র্যান্ডগুলো আরও উন্মুক্ত এবং সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিশ্ব বাজারে যুক্ত হচ্ছে এবং বিশ্বব্যাপী ভোক্তাদের মন জয় করে চলেছে।
তথ্যসূত্র: সিএমজি
মাহমুদ হাশিম/মাসউদ/এসএ