পিরামিডের মত সূচালো শীর্ষ, আশপাশে বড় কোনো পর্বত নেই। প্রবল ঠান্ডা বাতাসের তোড়ে তাই বরফ সরে গিয়ে চূড়ার কালো অংশ বেরিয়ে পড়ে। সেই থেকে নাম তার মহা কালো বা ‘মাকালু’।
এবার বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ উচ্চতার শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালু অভিযানে যাচ্ছেন এভারেস্ট জয়ী ডা. বাবর আলী। এই পর্বতের অবস্থান হিমালয়ের ২৭ হাজার ৮৩৮ ফুট উচ্চতায়।
বিশ্বে আট হাজার মিটার (২৬,২৪৬ ফুট) বা ততোধিক উচ্চতার পর্বত আছে সাকুল্যে চৌদ্দটি। এই ১৪টি পর্বত চূড়ার মধ্যে ইতোমধ্যে চারটি পর্বতের চূড়া ছুঁয়েছেন পর্বতারোহী বাবর আলী। এই কৃতিত্ব নেই আর কোন বাংলাদেশির।
বাবর এবার পাখির চোখ করেছেন পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালুকে। ‘এক্সপিডিশন মাকালুঃ দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক অভিযানে এই পর্বতারোহী চেষ্টা করবেন ‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’ খ্যাত এই চূড়া আরোহণের। পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’ এই অভিযানের আয়োজন করেছে। প্রসঙ্গত, এটি বাবরের পঞ্চম আট হাজার মিটার পর্বত অভিযান। নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালয়ে অবস্থিত এই পর্বতের উচ্চতা ৮৪৮৫ মিটার (২৭,৮৩৮ ফুট)।
রবিবার (০৫ এপ্রিল) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযানের বিস্তারিত জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অভিযানের ব্যবস্থাপক এবং ক্লাবটির সভাপতি ফরহান জামান। আরো বক্তব্য রাখেন ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স–এর উপদেষ্টা শিহাব উদ্দীন এবং পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ভিজুয়াল নিটওয়ারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ নুর ফয়সাল। এই অভিযানে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বাবরের পাশে আরোও দাঁড়িয়েছেন স্যাম–বন্ড, মাই হেলথ, চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন এবং রহমান্স গ্রোসারিজ। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দেশের পর্বতারোহণ মহলের পরিচিত মুখ ও পর্বত অনুরাগীরাও। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বাবরের হাতে তুলে দেওয়া হয় জাতীয় পতাকা।
সংবাদ সম্মলনে বাবর বলেন, ‘বিশ্বের ১৪টি আট হাজার মিটার পর্বত আরোহণের একটা সুতীব্র ও দীর্ঘ ইচ্ছা অনেকদিন ধরেই লালন করছি আমি। ইতোমধ্যে সে লক্ষ্যে বেশ কিছুদূর এগিয়েছি। মাকালু সে লক্ষ্যের পানে আরো একটি দৃঢ় পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে। ক্রমান্বয়ে বাকি পর্বতগুলোর চূড়া ছুঁতে চেষ্টা করব আমি। যদিও এ বছর আমার ইচ্ছে ছিল পাকিস্তানের কারাকোরাম হিমালয়ে অবস্থিত পৃথিবীর নবম উচ্চতম শৃঙ্গ নাঙ্গা পর্বত আরোহণের। তবে অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অপ্রতুলতা ও পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্তে বিদ্যমান উত্তেজনার প্রেক্ষিতে আমি লক্ষ্য পরিবর্তন করে পাখির চোখ করেছি মাউন্ট মাকালুকে। মাউন্ট মাকালু নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং একটি পর্বত। এটি বিখ্যাত এর খাড়া ঢাল ও প্রচণ্ড বাতাসের জন্য। চতুর্মুখী পিরামিড আকৃতির স্বতন্ত্র এই পর্বত আরোহীদের ভালোই পরীক্ষায় ফেলে। সেই চ্যালেঞ্জটুকু নিতে আমি প্রস্তুত। নতুন আর চ্যালেঞ্জিং কিছু করতে আমি সব সময়ই আনন্দ পাই।’
পর্বতারোহণে বাবরের পথচলা শুরু ২০১৪ সাল থেকে। ট্রেকিং–এর জগতে তার হাতেখড়ি হয় ২০১০ সালে; পার্বত্য চট্টগ্রামের নানান পাহাড়ে পথচলার মধ্য দিয়ে। চট্টগ্রামের পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স–এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক তিনি। এই ক্লাবের হয়েই গত বারো বছর হিমালয়ের নানান শিখরে অভিযান করে আসছেন তিনি। ভারতের উত্তরকাশীর নেহরু ইন্সটিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে মৌলিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন ২০১৭ সালে। ২০২২ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে হিমালয়ের অন্যতম দুর্গম ও টেকনিক্যাল চূড়া আমা দাবলাম (২২,৩৪৯ ফুট) আরোহণ করেন বাবর। ২০২৪ সালে একই অভিযানে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (২৯,০৩৫ ফুট) ও চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট লোৎসে (২৭,৯৪০ ফুট) আরোহণ করেন। একই অভিযানে দুটি আট হাজার মিটার পর্বত আরোহণের কৃতিত্ব নেই আর কোন বাংলাদেশি পর্বতারোহীর। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি আরোহণ করেন বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ পর্বত অন্নপূর্ণা–১ (২৬,৫৪৫ ফুট)। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই আরোহণ করেন বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম পর্বত মাউন্ট মানাসলু (২৬,৭৮১ ফুট)। প্রসঙ্গত, এটি প্রথম কোন বাংলাদেশির কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই কোন আট হাজার মিটার উচ্চতার শিখর আরোহণ। মাউন্ট মাকালু হতে যাচ্ছে আট হাজার মিটারের (২৬,২৪৬ ফুট বা ততোধিক) বেশি উচ্চতার পর্বতে বাবরের পঞ্চম অভিযান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ৭ এপ্রিল মাউন্ট মাকালু অভিযানের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়বেন বাবর। পর্বতারোহণের প্রয়োজনীয় অনুমতি ও নানান সরঞ্জাম কেনার কাজ শেষ করে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে টুমলিংটার এর উদ্দেশ্যে রওনা হবেন তিনি। দিনকয়েকের ট্রেক শেষ পৌঁছাবেন বেস ক্যাম্পে। মূল অভিযান শুরু হবে এখান থেকেই। বেস ক্যাম্প থেকে উপরের ক্যাম্পগুলোতে উঠানামা করে শরীরকে অতি উচ্চতার সাথে খাপ খাইয়ে নেবেন এই পর্বতারোহী। পুরো অভিযানে সময় লাগবে প্রায় পঞ্চাশ দিন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে মে মাসের ২য় কিংবা ৩য় সপ্তাহে চূড়ায় আরোহণ হতে পারে বলে জানিয়েছেন অভিযানের ব্যবস্থাপক ফরহান জামান।