আগামীকাল বুধবার (৭ অক্টোবর) ভোরে আর্জেন্টিনার আকাশি–সাদা জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি। প্রিয় সমর্থকদের সামনে আবেগঘন বিদায়ের এই মুহূর্তটি হবে এমন এক স্টেডিয়ামে, যার নামও তার উত্তরাধিকারের সঙ্গে যেন মিলে যায়, ‘মনুমেন্টাল’।
প্রায় ৮৫ হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থক ৩৯ বছর বয়সী এই তারকার জাদু দেখার জন্য উপস্থিত থাকবেন। বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচটির মাধ্যমে শেষ হবে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ২১ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম বুয়েনস আয়ার্সের এস্তাদিও মনুমেন্টালে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি টেলিভিশনে আরও কোটি মানুষ দেখবেন।
আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এই খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিচ্ছেন স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের আড়াই মাস পর।
আগস্টে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে মেসি লিখেছিলেন, “আমি আমার সর্বস্ব দিয়েছি; আমার আর দেওয়ার মতো কিছু নেই। তাছাড়া দারুণ কিছু তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসছে, যারা নিজেদের সুযোগ পাওয়ার যোগ্য।”
সোমবার (৬ অক্টোবর) বুয়েনস আয়ার্সের শহরতলি এজেইজায় তার নামে থাকা কমপ্লেক্সে দলের সঙ্গে শেষবারের মতো অনুশীলন করেন তিনি।
নিজের নায়ককে অনুশীলন করতে দেখতে কাজ থেকে ছুটি নিয়ে আসা খুচরা বিক্রয়কর্মী নাহুয়েল নিভা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, “এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই, এটাই শেষ।”
ইন্টার মায়ামির সঙ্গে মেসির চুক্তি রয়েছে ২০২৮ সাল পর্যন্ত। তবে দুই মাস আগে তার বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর তিনি জানিয়েছেন, ধারণার চেয়েও আগেই হয়তো স্থায়ীভাবে বুট তুলে রাখতে পারেন।
ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত মেসিকে বিদায় জানাতে কোনো আয়োজনই কম রাখা হয়নি।
কাতারে ফুটবলের সর্বোচ্চ সাফল্যে তার সঙ্গে থাকা এবং মেসি–পরবর্তী আর্জেন্টিনা দলকে নেতৃত্ব দিতে যাওয়া বেশ কয়েকজন সতীর্থ এই ম্যাচে খেলবেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ এবং ফরোয়ার্ড হুলিয়ান আলভারেজ ও লটারো মার্তিনেজ।
ম্যাচের পর অধিনায়কের আর্মব্যান্ড রোমেরোর হাতে তুলে দেওয়া হবে।
কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছেন, তার অতি প্রিয় অধিনায়কের রেখে যাওয়া “শূন্যস্থান” পূরণের চেষ্টা করবেন তিনি। মেসি ২০০৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের সময় যাদের অনেকেই পৃথিবীতেই আসেনি, সেই পরবর্তী প্রজন্মের কয়েকজনের পারফরম্যান্সও আশাব্যঞ্জক।
বিশ্বকাপ ফাইনালের পর মেসিকে ছাড়াই প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনা বুধবার কর্দোবায় প্রীতি ম্যাচে বলিভিয়াকে ৪–০ গোলে উড়িয়ে দেয়। এরপর শনিবার মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষেও দাপট দেখায় তারা।
আর্জেন্টিনার দুই উজ্জ্বল নতুন প্রতিভা ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুনো ও জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে নিজেদের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন। ম্যাচটি আর্জেন্টিনা জেতে ৭–০ গোলে।
এই ফলগুলো বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের হতাশা কিছুটা কাটাতে সাহায্য করেছে। ওই ম্যাচে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল মেসিকে এবং স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত ছিল। ম্যাচের শেষ দিকে তাদের কিছু খেলোয়াড়ের রুক্ষ আচরণেরও শাস্তি হয়েছে নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানার মাধ্যমে।
মেসি শুধু আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়ই নন, ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করে তিনি দলের সর্বোচ্চ গোলদাতাও। তার অ্যাসিস্টের সংখ্যাও রেকর্ড ৬৮টি।
মেসি ২০২২ সালে কাতারে আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের বিশ্বকাপ–খরা ঘুচিয়ে দেশবাসীর চিরন্ত কৃতজ্ঞতা অর্জন করেন এবং দিয়েগো ম্যারাডোনার যথার্থ উত্তরসূরি হিসেবে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেন।
আর্জেন্টিনা দলে মেসির সময়ে দেশটি ২০০৫ সালের বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপ, ২০০৮ সালের অনূর্ধ্ব–২৩ অলিম্পিক শিরোপা জেতে। তারা ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাও জেতে। এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের চ্যাম্পিয়নদের মধ্যকার ম্যাচ ২০২২ সালের ফিনালিসিমাতেও তারা জয় পায়।
তবে এই পথচলায় কান্নাও ছিল। বিশেষ করে ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, এ বছরের বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজয় এবং ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে অপ্রত্যাশিত হার ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে একটি বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়, মেসির বহুল কাঙ্খিত ১০ নম্বর জার্সি উত্তরাধিকারসূত্রে কে পাবেন?
স্কালোনি বলেন, “লিওর ম্যাচ পর্যন্ত আমরা ১০ নম্বর জার্সি কাউকে দেব না। এরপর দেখা যাবে।”