পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রকাশিত বুথফেরত জরিপ (এক্সিট পোল) ঘিরে রাজ্যের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি—ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মধ্যে তীব্র কথার লড়াই শুরু হয়েছে। অধিকাংশ সমীক্ষা বিজেপিকে এগিয়ে রাখলেও তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন তৃণমূল নেতারা।
ভোট শেষে প্রকাশিত ছয়টি সমীক্ষা সংস্থার রিপোর্টে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। পাঁচটি সংস্থা বিজেপির সম্ভাব্য জয়ের ইঙ্গিত দিয়েছে, যেখানে তাদের আসনসংখ্যা ১৪২ থেকে ২০৮–এর মধ্যে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূলের সম্ভাব্য আসন সংখ্যা এসব জরিপে ৮৫ থেকে ১৪০–এর মধ্যে দেখানো হয়েছে। তবে একটি সমীক্ষা সংস্থা তৃণমূলকে এগিয়ে রেখে তাদের আসন সংখ্যা ১৭৭ থেকে ১৮৭–এর মধ্যে থাকতে পারে বলে উল্লেখ করেছে।
প্রজাপোল অ্যানালেটিকস বিজেপিকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রেখেছে। তাদের জরিপ অনুযায়ী, দলটি ১৭৮ থেকে ২০৮টি আসন পেতে পারে, যেখানে তৃণমূলের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৫ থেকে ১১০টি আসন। পি–মার্কের হিসেবে বিজেপি ১৫০ থেকে ১৭৫টি এবং তৃণমূল ১১৮ থেকে ১৩৮টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পোল ডায়েরি বিজেপিকে ১৪২ থেকে ১৭১ এবং তৃণমূলকে ৯৯ থেকে ১২৭টি আসনের মধ্যে রেখেছে। ম্যাট্রিজ তাদের সমীক্ষায় বিজেপিকে ১৪৬ থেকে ১৬১ এবং তৃণমূলকে ১২৫ থেকে ১৪০টি আসন দিয়েছে। চাণক্য স্ট্র্যাটেজিকসের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিজেপি পেতে পারে ১৫০ থেকে ১৬০টি আসন এবং তৃণমূল পেতে পারে ১৩০ থেকে ১৪০টি আসন।
আর, এই ধারার সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে পিপলস পালস তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে। তাদের সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, তৃণমূল ১৭৭ থেকে ১৮৭টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে পারে, আর বিজেপি পেতে পারে ৯৫ থেকে ১১০টি আসন।
এদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জোর দিয়ে বলেছেন, ৪ মে ফল প্রকাশের দিনই প্রমাণ হবে তৃণমূলই জিতেছে এবং রাজ্যে আবারও তাদের সরকার গঠিত হবে। তিনি দাবি করেন, বিজেপি ৫০টির বেশি আসন পাবে না।
একই সুরে দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, জনগণ এবার বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তৃণমূল বিপুল ব্যবধানে জয় পাবে। এমনকি ২৩৫টি আসন জয়ের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, এই রাজ্যে তৃণমূলের শাসনের অবসান ঘটবে এবং দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে বিজেপি নতুন সরকার গঠন করবে। তার মতে, এক্সিট পোলের ফলাফল জনমতের প্রতিফলনই তুলে ধরেছে।
অবশ্য, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আগাম পূর্বাভাস বা এক্সিট পোল কতটা সঠিক হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ রাজ্যে সমীক্ষার ফল অনেক সময় বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন। সে সময় প্রায় সব সমীক্ষাই বলেছিল তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে সমান–সমান লড়াই হবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল ২১৩টি আসন জিতে বিশাল জয় পায়, আর বিজেপি থমকে যায় মাত্র ৭৭টি আসনে।
পূর্বাভাসে ভুল হওয়ার ইতিহাস আরও আছে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে তৃণমূল ‘কোনোমতে‘ ক্ষমতায় ফিরবে বলা হলেও, দলটি যে এত বড় ব্যবধানে জিতবে তা কোনো সমীক্ষাই বুঝতে পারেনি। সেবারের নির্বাচনে ২১১টি আসন নিয়ে আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ক্ষমতায় ফেরে তৃণমূল।
পশ্চিমবঙ্গের অতীত ইতিহাস বলছে, বুথফেরত জরিপের সংখ্যার চেয়েও তৃণমূল স্তরের মানুষের ‘আন্ডারকারেন্ট‘ বা গোপন লহরি অনেক সময় বেশি শক্তিশালী হয়। তাই এক্সিট পোলের ফলাফলকে চূড়ান্ত রায় না ধরে একটি সাধারণ আভাস হিসেবে দেখাই ভালো।