স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সরকার হাম (মিজেলস) রোগ মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে এবং জনগণের মধ্যে অযথা আতঙ্ক না ছড়িয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। দেশে উদ্ভূত হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে।
বুধবার (০৮ এপ্রিল) সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানার কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধিতে জরুরী জন–গুরুত্বসম্পন্ন মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে টিকা সরবরাহ ও প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, ইতোমধ্যে সারাদেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গত ৫ এপ্রিল থেকে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরেও এ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মূল্যায়নে ঢাকা শুরুতে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত না হলেও সরকার রাজধানীকেও অন্তর্ভুক্ত করে আগাম প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যমান মজুদ ঘাটতি পূরণে বিপুল পরিমাণ টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যা দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এডিবির মাধ্যমে সুইজারল্যান্ড হয়ে ইউনিসেফের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
প্রচলিত টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ ও দুর্নীতির ঝুঁকি থাকায় সরকার সরাসরি ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে টিকা পাওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, হাম একটি সংবেদনশীল জনস্বাস্থ্য ইস্যু হলেও এটিকে কেন্দ্র করে ভয় বা বিভ্রান্তি ছড়ানো ঠিক নয়। সন্তান হারানোর বেদনা যে কত গভীর, তা একজন অভিভাবকই সবচেয়ে ভালো বোঝেন।
মন্ত্রী জানান, মহাখালী সংক্রামক রোগ হাসপাতালে তিনি হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। সেখানে একটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। বিশেষ করে ওই হাসপাতালে পর্যাপ্ত নিবিড় পরিচর্যা (আইসিইউ) সুবিধার অভাব তাকে ব্যথিত করে তোলে।
পরিসংখ্যান নিয়ে বিভ্রান্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো তথ্য উপস্থাপনের আগে তা নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করা জরুরি। বিভিন্ন সূত্রে ৯৮ জন মৃত্যুর কথা বলা হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ যাচাই অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যু সরাসরি হামজনিত বলে নিশ্চিত হয়েছে। বাকিগুলোর ক্ষেত্রে অন্যান্য জটিলতা বা সহ–রোগ থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে করোনাভাইরাস টিকা নিয়েও নানা গুজব ছড়ানো হয়েছিল—কেউ বলেছিল টিকা নিলে মানুষ পঙ্গু হয়ে যাবে বা কিডনি বিকল হবে। কিন্তু বাস্তবে সেসব আশঙ্কা সত্য হয়নি। একইভাবে হাম নিয়েও অতিরঞ্জিত ভয় ছড়ানো উচিত নয়।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে, যাতে পূর্ববর্তী সময়ের ঘাটতি কাটিয়ে একটি শক্তিশালী টিকা মজুদ গড়ে তোলা যায়।
তিনি আরও বলেন, সরকার শূন্য অবস্থা থেকে টিকা ব্যবস্থাপনাকে পুনর্গঠন করেছে এবং এখন একটি কার্যকর সাপ্লাই চেইন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের গৃহীত সমন্বিত উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দায়িত্বশীল আচরণ, তথ্য যাচাই এবং গুজব প্রতিরোধে সকলকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।