বিবাহ বিচ্ছেদে কী কী আইনগত নিয়ম মানতে হয়?

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক
বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাকের ক্ষেত্রে ধর্মভেদে আইন ও পদ্ধতি ভিন্ন।

বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাকের ক্ষেত্রে ধর্মভেদে আইন ও পদ্ধতি ভিন্ন। বাংলাদেশে মুসলিমদের বিবাহবিচ্ছেদ মূলত মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এবং মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯–এর আওতায় পরিচালিত হয়। অন্যদিকে খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯সহ সংশ্লিষ্ট আইন প্রযোজ্য। হিন্দুদের ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদের আইনগত কাঠামোও মুসলিম ও খ্রিস্টানদের থেকে আলাদা।

মুসলিম আইনে তালাকের নিয়ম— মুসলিম আইনে স্বামী তালাক দিতে পারেন। তবে শুধু মৌখিকভাবে তালাক ঘোষণা করলেই আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় না। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১–এর ৭ ধারায় নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

তালাক ঘোষণার পর নোটিশ: স্বামী তালাক ঘোষণা করার পর যত দ্রুত সম্ভব সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র/চেয়ারম্যান বা সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে লিখিত নোটিশ পাঠাবেন। একই সঙ্গে ওই নোটিশের একটি কপি স্ত্রীকে দিতে হবে।

সালিশি পরিষদ গঠন: নোটিশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করার জন্য সালিশি পরিষদ গঠন করবেন। সাধারণত উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে এই পরিষদ গঠিত হয়।

৯০ দিনের প্রক্রিয়া: তালাকের নোটিশ চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছানোর দিন থেকে ৯০ দিন পার না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হয় না। এই সময়ের মধ্যে স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতা হলে তালাক প্রত্যাহার করা যেতে পারে। স্ত্রী গর্ভবতী থাকলে গর্ভাবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আইন অনুযায়ী তালাক কার্যকরের সময় নির্ধারিত হয়।

স্ত্রী কীভাবে বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারেন?

কাবিননামায় যদি স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করা থাকে, তাহলে তিনি সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়াসহ আইন নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

এ ছাড়া স্ত্রী আদালতের মাধ্যমেও বিবাহবিচ্ছেদ চাইতে পারেন। মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু কারণে স্ত্রী আদালতে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে—স্বামীর দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা, ভরণপোষণ না দেওয়া, নিষ্ঠুরতা বা নির্যাতনসহ আইনে উল্লেখিত অন্যান্য কারণ।

খোলা বা সমঝোতার মাধ্যমে বিচ্ছেদ: স্বামী–স্ত্রী পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতেও বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ করতে পারেন। এ ধরনের বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে দেনমোহর বা অন্যান্য আর্থিক অধিকার কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, তা পরিস্থিতি ও সমঝোতার শর্তের ওপর নির্ভর করে।

খ্রিস্টানদের বিবাহবিচ্ছেদ— বাংলাদেশে খ্রিস্টানদের বিবাহবিচ্ছেদ মূলত ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯–এর অধীনে আদালতের মাধ্যমে হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট আইনগত কারণ দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন করতে হয়। মামলার ধরন ও পক্ষভেদে প্রয়োজনীয় প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়াও ভিন্ন হতে পারে।

হিন্দুদের ক্ষেত্রে— বাংলাদেশে হিন্দু বিবাহবিচ্ছেদের আইনগত কাঠামো মুসলিম বা খ্রিস্টানদের মতো নয়। প্রচলিত হিন্দু ব্যক্তিগত আইনে বিবাহবিচ্ছেদের সাধারণ বিধান নেই। তবে বিবাহবিচ্ছেদ, পৃথক বসবাস, ভরণপোষণ ও অন্যান্য অধিকার নিয়ে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তালাকের পর দেনমোহর ও ভরণপোষণ: বিবাহবিচ্ছেদের পর স্ত্রীর প্রাপ্য দেনমোহর আদায়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেনমোহর পরিশোধ না হয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী তা দাবি করা যেতে পারে।

এ ছাড়া তালাকের পর ভরণপোষণের বিষয়টিও প্রযোজ্য আইন ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। বিশেষ করে ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ নিয়ে মুসলিম আইনে পৃথক বিধান রয়েছে।

সন্তানের জিম্মা ও অভিভাবকত্ব: বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তানের জিম্মা বা অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ হলে বিষয়টি আদালতে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে আদালত সিদ্ধান্ত দেন। গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০সহ সংশ্লিষ্ট আইন এখানে প্রযোজ্য হতে পারে।

আইনি পরামর্শ: বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে শুধু মৌখিক ঘোষণা বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াকে যথেষ্ট মনে করা ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী নোটিশ, সালিশি ও প্রয়োজনীয় আদালতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি। ব্যক্তিভেদে পরিস্থিতি ও আইনি অধিকার ভিন্ন হতে পারে। তাই তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদের আগে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More