দেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ এবং জাতীয় নীতিমালায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ। রোববার (২৯ মার্চ) রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত এক নীতি–সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
‘পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধে টেকসই সরকারি অর্থায়ন’ বিষয়ক নীতি–সংলাপটি আয়োজন করে গণমাধ্যম ও যোগাযোগবিষয়ক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ‘সমষ্টি’। এতে সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর।
সংলাপে জাতীয় সংসদ সদস্য, মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক এবং সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সমষ্টির নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুরুজ্জামান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এবং সঞ্চালনা করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের একটি। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি ৪০টি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ। ১–৫ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ পানিতে ডোবা। এটি এখন একটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবসময়ই সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, যদি আমাদের একটি শিশু অকালে ঝরে যায়, তবে তা আমাদের সামগ্রিক অগ্রগতির পথে বড় একটি অপূর্ণতা। তাই এই নীরব মহামারি রুখতে এখনই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য আমরা কমিউনিটিভিত্তিক শিশু–যত্ন কেন্দ্র চালু রাখার কথা ভাবছি। পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে সচেতন করতে হবে, যাতে বাড়ির পাশের পুকুর বা জলাশয় তাদের সন্তানের জন্য মরণফাঁদ না হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই নীতি–সংলাপ থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব। আমাদের সরকার বাজেট ও জাতীয় নীতিমালায় শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে বদ্ধপরিকর।’
সংলাপে গবেষণাভিত্তিক নীতি পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন সমষ্টির পরিচালক (গবেষণা ও যোগাযোগ) রেজাউল হক। উপস্থাপনায় বলা হয়, বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যু শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এবং প্রতিবছর ১৪ হাজারের বেশি শিশু এতে প্রাণ হারায়। তিনি উল্লেখ করেন, কমিউনিটিভিত্তিক শিশু–যত্ন কেন্দ্র, সাঁতার প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো কার্যকর উদ্যোগ ইতোমধ্যে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে এসব কার্যক্রম এখনও প্রকল্পভিত্তিক হওয়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় এর ধারাবাহিকতা ও সম্প্রসারণ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে টেকসই সরকারি বিনিয়োগ ও বিকল্প অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আলোচনায় দেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সমস্যার গভীরতা ও ঝুঁকির মাত্রা তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা।
সরকারি খাতের পক্ষ থেকে পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে বিদ্যমান উদ্যোগ ও কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন কর্মসূচি তুলে ধরেন এবং ভবিষ্যতে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
পরবর্তীতে টেকসই অর্থায়নের সম্ভাব্য পথ নিয়ে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন সংস্থা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা বাজেটে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বহুপক্ষীয় অংশীদারিত্ব এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রম বিস্তারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। শেষে পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার এবং টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এই নীতি–সংলাপের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশে পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পরিবর্তন আসবে।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম, চর্চা ডট কম–এর সম্পাদক সোহরাব হাসান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অধিশাখা) মো. মামুনুর রশীদ, দৈনিক জনকণ্ঠের নগর সম্পাদক কাওসার রহমান, ইউনিসেফ প্রতিনিধি মুনীরা হাসান, দৈনিক যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক শুচি সৈয়দ, দীপ্ত টিভির অনলাইন ইনচার্জ মাসউদ বিন আব্দুর রাজ্জাক, একাত্তর টিভির শাহনাজ শারমীন, দৈনিক ইত্তেফাকের রাবেয়া বেবী, জাতীয় প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটির সদস্য দেশ শাহনাজ পলি, সিআইপিআরবি–এর গবেষক ড. আল–আমিন ভুঁইয়া, সিনারগোস–এর বাংলাদেশ প্রোগ্রাম ম্যানেজার রিজওয়ানুল হক খান, চ্যানেল ওয়ান–এর সুকন্যা আমীরসহ অন্যান্যরা।