
ঢাকা শহরে চলতে পারবে না লাইসেন্সবিহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা

ঢাকা শহরে যাত্রী পরিবহনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের নীতিমালা প্রকাশ করেছে সরকার। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী— লাইসেন্স ব্যতীত ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করতে পারবে না।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশার এই নীতিমালা প্রকাশ করা হয়।
এতে বলা হয়েছে, ই–রিকশা নিবন্ধনের জন্য কোনো ব্যক্তিকে কর্তৃপক্ষের নিকট তফসিল–২ এ উল্লিখিত ফিসহ নিম্নবর্ণিত কাগজপত্রাদি দাখিলপূর্বক তফসিল–১ এ বর্ণিত ফরম অনুযায়ী আবেদন করতে হবে। রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রাপ্ত আবেদন, দাখিলকৃত কাগজাদি এবং বুয়েট কর্তৃক নির্ধারিত ই–রিকশার প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের আলোকে যাচাই–বাছাইপূর্বক সন্তুষ্ট হলে, আবেদন প্রাপ্তির ৩০ (ত্রিশ) কার্যদিবসের মধ্যে ই–রিকশা নিবন্ধন করবে।
কর্তৃপক্ষ প্রতিটি নিবন্ধিত ই–রিকশার জন্য একটি কিউআর কোডযুক্ত ইউনিক নিবন্ধন নম্বর ও তফসিল–৩ অনুযায়ী নম্বর প্লেট প্রদান করবে এবং কিউআর কোডযুক্ত নিবন্ধন নম্বর ই–রিকশার দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে।
কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত নিবন্ধনের মেয়াদ হবে তা প্রদানের তারিখ হতে ৫ (পাঁচ) বছর।
কর্তৃপক্ষ উপ–বিধি (২) এর অধীন প্রাপ্ত আবেদন যাচাই–বাছাইপূর্বক সন্তুষ্ট না হলে, আবেদন না–মঞ্জুর করবে এবং না–মঞ্জুরের কারণ আবেদনকারীকে ৭ (সাত) কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে অবহিত করবে।
উপ–বিধি (৬) এর অধীন কোনো আবেদন না–মঞ্জুর করা হলে, উক্ত না–মঞ্জুর আদেশ দ্বারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদেশ প্রাপ্তির ১০ (দশ) কার্যদিবসের মধ্যে আদেশ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট আপিল করতে পারবেন এবং উক্ত আপিলের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে যেকোনো এক বা একাধিক সিটি কর্পোরেশন হতে অনধিক ৫ (পাঁচ) টি ই–রিকশার নিবন্ধন গ্রহণ করা যাবে। তবে এক সিটি কর্পোরেশনে নিবন্ধিত ই–রিকশা অন্য কোনো সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো যাবে না।
বুয়েট নির্ধারিত ই–রিকশার প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ডিজাইন স্পেসিফিকেশন মোতাবেক তফসিল ৪ অনুযায়ী ফিটনেস সার্টিফিকেট ও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগ কর্তৃক প্রতিস্বাক্ষর ব্যতিরেকে কোনো ই–রিকশার নিবন্ধন প্রদান করা যাবে না এবং নবায়ন করা যাবে না।
ফিটনেস প্রদানকারী ও প্রতিস্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্টভাবে নিবন্ধনের রেকর্ড সংরক্ষণ করবে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকাশিত নীতিমালায় বলা হয়েছে, এস. আর. ও. নম্বর ৩৮৪–আইন/২০২৬। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ (২০০৯ সনের ৬০ নং আইন) এর ধারা ১২০ এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার নিম্নরূপ বিধিমালা প্রণয়ন করল।
এই বিধিমালা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই–রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬ নামে অভিহিত হবে। এটি দেশের সকল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় চলাচলকারী ই–রিকশার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
বর্তমানে রাস্তায় চলাচলকৃত ই–রিকশার ক্ষেত্রে বুয়েট কর্তৃক নির্ধারিত ই–রিকশার প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আবশ্যকীয় ডিজাইন স্পেসিফিকেশন মোতাবেক কাঠামোগত সংশোধন করে অনুমোদন প্রদান করা যাবে এবং উপ–বিধি (১১) অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগ কর্তৃক প্রতিস্বাক্ষরসহ ফিটনেস সর্টিফিকেট গ্রহণ করতে হবে।
পর্যায়ক্রমে ই–রিকশাসমূহকে বিমার আওতায় আনা হবে। প্রতিটি ই–রিকশাকে বুয়েট কর্তৃক নির্ধারিত ই–রিকশার প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হতে হবে।
প্রতিটি ই–রিকশার ইকোনোমিক লাইফটাইম হবে নিবন্ধনের তারিখ হতে ১২ (বারো) বছর এবং ইকোনমিক লাইফটাইম শেষ হওয়ার পর নম্বর প্লেটসহ সংশ্লিষ্ট ই–রিকশার নিবন্ধন বাতিল করতে হবে।
প্রতিটি ই–রিকশায় স্পিডোমিটার বা ওডোমিটার স্থাপন করতে হবে। ত্রুটিযুক্ত ও অবৈধ যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। কোনো যান্ত্রিক বা নিরাপত্তা ত্রুটিযুক্ত এবং নিবন্ধনবিহীন অবৈধ ই–রিকশা সড়কে চালানো যাবে না।
ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ির সম্মুখভাগে দৃষ্টিগ্রাহ্য অংশে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চলাচল অযোগ্য সাইনবোর্ড প্রদর্শন করে তা মেরামতের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মেট্রোপলিটন এলাকার ট্রাফিক বিভাগ বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যৌথভাবে অথবা পৃথকভাবে অবৈধ ই–রিকশা চলাচল বন্ধের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
সড়ক ব্যবহার নিয়মাবলি—
ই–রিকশা জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও প্রধান বাস চলাচলের সড়ক বা করিডোর এবং প্রশাসন কর্তৃক, সময় সময়, নিষেধাজ্ঞা আরোপিত সড়কে চলাচল করতে পারবে না।
ই–রিকশা ফুটপাতে চলাচল করতে পারবে না।
ই–রিকশাচালক সর্বদা সড়কের বাম লেন অনুসরণ করে চলাচল করবে।
ই–রিকশাচালক ড্রাইভিং করা অবস্থায় মোবাইল ব্যবহার করতে পারবে না।
ই–রিকশাচালক নিয়ম বহির্ভূতভাবে ওভারটেকিং এবং লেন পরিবর্তন করতে পারবে না।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ই–রিকশায় চালক ব্যতীত আকারভেদে ২ (দুই) অথবা ৪ (চার) জনের অধিক যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য মালামাল ব্যতীত অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা যাবে না।
ই–রিকশায় ৪০ (চল্লিশ) ডেসিবেলের অধিক তীব্রতাসম্পন্ন হর্ন ব্যবহার করা যাবে না।
স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় বা জনবহুল স্থানে ই–রিকশার সর্বোচ্চ গতি হবে প্রতি ঘণ্টায় ১৫ (পনেরো) কিলোমিটার।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও রুট পারমিট—
ই–রিকশা চলাচলের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে রুট (চলাচলের সড়ক) নির্ধারণ করে দেবে। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় রুট হবে জোনভিত্তিক এবং এক জোনের ই–রিকশা অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না।
ই–রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণের সুবিধার্থে সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন এবং ট্রাফিক বিভাগ জোনভিত্তিক বিভক্তকরণসহ জোনভিত্তিক ই–রিকশার সংখ্যা, রুট (চলাচলের সড়ক) ও রং (ই–রিকশার জন্য নির্দিষ্ট রং) নির্ধারণ চূড়ান্ত করবে।
কর্তৃপক্ষ স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, ব্যাটারি ও ই–রিকশা রক্ষণাবেক্ষণ এবং আনুষাঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে চালকদের জন্য প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে পারবে।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিটি ওয়ার্ডে বা উপযুক্ত স্থানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পার্কিং এলাকা নির্ধারণ করবে কর্তৃপক্ষ।
বিধিমালা অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স প্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট বা নির্দিষ্ট গ্যারেজে ই–রিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরশক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্ব, বেসরকারি খাত বা অন্য উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন, গ্যারেজ ও ব্যাটারি বিনিময় কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেবে কর্তৃপক্ষ। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।
ই–রিকশার ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধিতে উদ্যোগ গ্রহণ ও উৎসাহিত করতে হবে এবং অনিয়ন্ত্রিত ও নিয়ম বহির্ভূত চার্জিং পরিহার করতে হবে।
পর্যায়ক্রমে বৈধভাবে নিবন্ধিত চার্জিং স্টেশনেই ই–রিকশার ব্যাটারি চার্জ করা যাবে। চার্জিং স্টেশনে নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিডের সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করতে হবে। এ ব্যবস্থায় দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে রাতে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করা যাবে।
চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নিতে হবে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জ করলে বিদ্যমান সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় দণ্ড প্রদান করা হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা, তফসিলি ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানি অনুমোদিত মানের ই–রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে ই–রিকশা চালক ও মালিকদের ঋণ সহায়তা প্রদান করতে পারবে।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের বিধান অনুসরণ— ই–রিকশা উৎপাদন, আমদানি, ব্যবহার এবং ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবস্থাপনার সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫, এর অধীনে প্রণীত বিধিমালা এবং জারীকৃত নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি কিংবা এর কোনো অংশ খোলা জায়গা, মাটি, জলাশয় বা সাধারণ বর্জ্যে ফেলতে বা পোড়াতে পারবে না।
এসএ






এই সংবাদে মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ আছে।