বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যাদের নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে, জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী (এম এ জি ওসমানী) তাদের অন্যতম। বাঙালির কাছে বঙ্গবীর নামে পরিচিত এই সামরিক নেতা ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে একটি সুসংগঠিত সামরিক শক্তিতে রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন।
আজ ১ সেপ্টেম্বর, মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী।
১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে জন্ম নেওয়া ওসমানী ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ও দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা। ১৯৩৪ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তিনি সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেন। ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ–ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে শুরু করেন তার সামরিক জীবন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বার্মা রণাঙ্গনে দায়িত্ব পালন করেন। ভারত ভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সামরিক জীবনে তিনি জেনারেল স্টাফ ও সামরিক পরিচালনাসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
ওসমানীর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল একটি সদ্যোজাত জাতির বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে একটি সুসংগঠিত সামরিক কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা। তিনি শুধু যুদ্ধের নির্দেশদাতা ছিলেন না; মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, যুদ্ধক্ষেত্রের সমন্বয়, সেক্টরভিত্তিক অভিযান এবং গেরিলা কৌশলকে কার্যকর করার ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দিয়েছেন।
একদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ, অন্যদিকে গেরিলা আক্রমণ—দুই কৌশলের সমন্বয় ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নেওয়া হয়। তার নেতৃত্বেই মুক্তিবাহিনী ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর ওসমানীকে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭২ সালে সামরিক দায়িত্ব থেকে অবসর নিয়ে তিনি সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। পরে রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন।
১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এই মহান সামরিক নেতা। পরে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
আজও বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে তার নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধায়। তিনি ছিলেন সেই ‘বঙ্গবীর’, যিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা লাখো মুক্তিযোদ্ধাকে একটি সামরিক কাঠামোর অধীনে সংগঠিত করেছিলেন। তার নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি—একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম।
সূত্র: বাসস, উইকিসংকলন, মুক্তিযুদ্ধ ই আর্কাইভ
এসএ