কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন চিরদিনই সেরা, তাঁর ভেতরে ছিল জাত নেতৃত্ব। তিনি যখন দুষ্টুমি করতেন তখন ছিলেন দুষ্টু দলের সর্দার। মসজিদে কাজ করার সময় হয়েছিলেন সেখানকার ইমাম, লেটো দলে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল ওস্তাদের আসন। সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে তিনি ছিলেন হাবিলদার, আর কবিতা লিখতে গিয়ে তিনি হয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের ‘বিদ্রোহী কবি‘। সমাজের বৈষম্য, অনাচার ও ব্রিটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম একক বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সমাজের সর্বস্তরে ন্যায় ও সাম্য বিধান করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
১৯৪২ সালের ৯ জুলাই এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত নজরুল বেঁচে ছিলেন শিশুর মতো। দীর্ঘ ১২,৪৭০ দিন পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট রবিবার, সকাল দশটা দশ মিনিটে পুষে রাখা অভিমানের চির অবসান ঘটিয়ে বাংলা সাহিত্যের এই চিরবিদ্রোহী কবি ইহলীলা সমাপ্ত করেন। নির্মম মৃত্যুর মূল্যে কবি প্রমাণ করেন এতদিন তিনি জীবিত ছিলেন।
কেমন ছিল কবির শেষ দিনটি? সেদিনের আকাশ ছিল বিষাদাচ্ছন্ন। শ্রাবণের কালো মেঘ ভোর বেলাতেই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল নীলিমার নীল দিগন্তকে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহে কবির স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। ২৭শে আগস্ট সন্ধ্যার পর থেকেই তাঁর শরীরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। ২৮শে আগস্ট ডাক্তাররা জানান তিনি ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। ২৯শে আগস্ট সকালে তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়। তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। বুকে কফ জমে গলায় এক ধরনের শব্দ হতে থাকে। কফ বের করার জন্য সাকশন মেশিন লাগানো হয়। সকাল ৯টার দিকে সিস্টার শামসুন্নাহার কবির মুখে চার চামচ পানি তুলে দেন। সকাল ৯.১৫ মিনিটের দিকে আবার পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু কোনোভাবেই জ্বরের প্রকোপ কমছিল না। বিভিন্ন ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো উপশম হয় না। বহুকাল কঠিন রোগে ভোগার পর ব্রঙ্কোপনিউমোনিয়া অনেক সময় জীবনের অবসান ঘটায়। কবির শরীর স্পর্শ করা হয়। তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। কবি সকাল ১০টার দিকে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। আরও ১০ মিনিট পরে অর্থাৎ সকাল ১০.১০ মিনিটে হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন, শিরা–উপশিরায় রক্ত সঞ্চালন এবং ফুসফুসে বাতাসের আনাগোনা বন্ধ হয়ে যায়। চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন কবি পাড়ি জমান অন্য ভুবনের দিকে।
বেতার ও টেলিভিশনে নজরুলের মৃত্যুসংবাদ প্রচার হয়। মুহূর্তে দেশ–বিদেশে প্রচারিত হয় এই সংবাদ। গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে মানুষ ছুটে আসে পি. জি. হাসপাতালে। কবির মরদেহ রাখা হয় পি. জি. হাসপাতালের কনফারেন্স রুমে। এগারোটার দিকে তাঁর মরদেহ কেবিন থেকে বের করে আউটডোরে দোতলায় মঞ্চে আনা হয়।
পি. জি. হাসপাতালের সভা কক্ষে নজরুলের কবরের স্থান নির্ধারণের জন্যে এক জরুরি সভা বসে। অনেক আলোচনার পর অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণকেই নির্বাচিত করা হয়। দুপুর ২টার সময় ট্রাকযোগে কবির মরদেহ টিএসসিতে আনা হয়। বিপুল জনতার ভিড় ঠেলে টিএসসিতে পৌঁছাতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। হাজার হাজার মানুষ ফুলে ফুলে শেষ শ্রদ্ধা জানায় তাদের প্রিয় কবিকে। বিকেল সাড়ে চারটায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। স্মরণকালের বৃহত্তম এ জানাজার নামাজে লক্ষাধিকেরও অধিক মানুষ অংশ নেয়।
পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কাজী নজরুল ইসলামকে দাফন করা হয়। সেনাবাহিনীর একটি দল গোলা ছুড়ে বিউগল বাজিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেখায়। দুই দিন রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। সারা দেশে অর্ধনমিত রাখা হয় জাতীয় পতাকা।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী ২৯ আগস্টের পরিবর্তে ২৭ আগস্ট পালন করা নিয়ে প্রতি বছরই সাধারণ মহলে কিছু কৌতূহল ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। আপাতদৃষ্টিতে একে তারিখের পরিবর্তন মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে একটি অত্যন্ত যৌক্তিক, বিজ্ঞানসম্মত এবং সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত।
কাজী নজরুল ইসলাম যখন ১৯৭৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন, তখন ইংরেজি তারিখ ছিল ২৯ আগস্ট এবং বাংলা তারিখ ছিল ১২ ভাদ্র। কিন্তু পুরোনো বাংলা পঞ্জিকায় লিপ–ইয়ার বা অধিবর্ষের জটিলতার কারণে প্রতি বছর ১২ ভাদ্র তারিখটি ইংরেজি ক্যালেন্ডারে স্থির থাকত না। কোনো বছর তা ২৮ আগস্ট, কোনো বছর ২৯ আগস্ট, আবার কোনো বছর ৩০ আগস্টে গিয়ে পড়ত।
এই চিরস্থায়ী সমস্যার অবসান ঘটাতে বাংলা একাডেমির বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশে বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। নতুন নিয়মে বৈশাখ থেকে আশ্বিন—বছরের প্রথম ছয় মাসকে স্থায়ীভাবে ৩১ দিনের করা হয়। এই বিজ্ঞানসম্মত বিন্যাসের ফলে আন্তর্জাতিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে বাংলা তারিখের একটি স্থায়ী গাণিতিক সমন্বয় তৈরি হয়। আর এই নতুন হিসাবেরই স্বাভাবিক সূত্র ধরে বাংলা ‘১২ ভাদ্র‘ তারিখটি প্রতি বছর ইংরেজি ‘২৭ আগস্ট‘-এ এসে স্থায়ী রূপ নেয়।
এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট যে, কবির মৃত্যুর মূল দিন অর্থাৎ ‘১২ ভাদ্র‘ পরিবর্তন করা হয়নি। কবি যে বাংলা তারিখে বিদায় নিয়েছিলেন, সেই তারিখটিকে অত্যন্ত যত্নসহকারে অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। কেবল বৈজ্ঞানিক সংস্কারের কারণে ইংরেজি তারিখটি পেছনের দিকে সরে এসেছে।
বিদ্রোহী নজরুল জীবনে কারোর কাছে মাথা নত করেননি। মৃত্যুর কাছেও তিনি নতি স্বীকার করেননি। তিনি তাঁর জীবনের সমস্ত ধ্যান ও জ্ঞান দিয়ে যৌবনের বন্দনা করে গেছেন। নিপীড়িত, বঞ্চিত ও পরাধীন মানুষের প্রতিনিধি হয়ে নজরুল শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে পরিচালিত সংগ্রামে তাঁর মানবজীবন উৎসর্গ করে গেছেন। যখনই সমাজে অসাম্য এবং অত্যাচারীর খড়্গ–কৃপাণের কড়াঘাতে ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল‘ দেখা দেবে, তখনই ধূমকেতুর দীপ্ত শিখা হয়ে নজরুল যুগে যুগে ফিরে আসবেন মানুষের অভয় বাণী হয়ে।
তথ্যসূত্র:
-
{চিরঞ্জীব নজরুল, মোহাম্মদ নূরুল হুদা, পৃষ্ঠা ৭০}
-
{ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল, অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর}
-
{জনগণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কল্পতরু সেনগুপ্ত (১৯৯২) পৃষ্ঠা– ২২৭–২২৮}
-
{নজরুল জীবনী, অরুণ কুমার বসু, পৃষ্ঠা–৫৩২}
-
{হায়াৎ মামুদ, কিশোর জীবনী – কাজী নজরুল ইসলাম, পৃষ্ঠা–৯৪}
-
{নজরুল ইসলাম, চিত্ররূপময় আলেখ্য, হায়াৎ মামুদ, পৃষ্ঠা–১৪৭}
-
{ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল, সৌমিত্র শেখর, পৃষ্ঠা– ৩০–৩১}
-
{কাজী নজরুল ইসলাম, জীবন ও সাহিত্য, রফিকুল ইসলাম, পৃষ্ঠা–২২৭–২২৮}
-
{কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনী গ্রন্থমালা; তাহা ইয়াসমিন, পৃষ্ঠা –৮৪}
-
{গোলাম মুরশিদ, বিদ্রোহী রণক্লান্ত পৃষ্ঠা– ৫০৯–৫১১}
দেবব্রত নীল: লেখক ও গবেষক