ট্রাম্পের নতুন শুল্কের পাল্টা পদক্ষেপ ঘোষণা করবে কানাডা

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কের প্রতিক্রিয়া মঙ্গলবার ঘোষণা করবে কানাডা। একসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত দুই প্রতিবেশী দেশ এখন ক্রমেই বাণিজ্যযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

কানাডা সরকার সোমবার রাতে জানিয়েছে, অর্থ, শিল্প ও শ্রমমন্ত্রীসহ সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তা অটোয়ায় সংবাদ সম্মেলন করে নতুন মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে কানাডার পদক্ষেপের বিস্তারিত তুলে ধরবেন।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

কয়েক সপ্তাহের আলোচনা চলার পর গত শুক্রবার কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র কিছু কানাডীয় পণ্যের ওপর নতুন করে আরোপিত ৫০ শতাংশ মার্কিন শুল্ক ঠেকাতে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। শনিবার থেকে ওই শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও জানিয়েছে কানাডা।

সোমবার ট্রাম্প আরও ঘোষণা করেন, আগামী বছর থেকে কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করা হবে।

বর্তমানে কানাডীয় গাড়ির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে, যা গাড়িতে ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে আসা উপাদান বা অ-মার্কিন উপাদানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা ইস্পাতের ওপর সাধারণভাবে ৫০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে।

এদিকে ট্রাম্পের প্রস্তাবকে ‘খারাপ চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে পাল্টা শুল্ক কার্যকরের ঘোষণা দেন।

এসব শুল্কের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত ও দুগ্ধশিল্প পড়বে। পাশাপাশি কৃষি সরঞ্জাম, কাগজ ও ইলেকট্রনিকসসহ আরও কয়েকটি খাতও এর আওতায় থাকবে।

সোমবার রাতে প্রকাশিত সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই কঠিন সময়ে কানাডার শ্রমিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা ও সহায়তা দিতে মন্ত্রীরা নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করবেন।’

কার্নি সোমবার বলেছেন, ‘ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার লক্ষ্য ‘সবসময়ই কানাডিয়ানদের জন্য সেরা চুক্তি নিশ্চিত করা। কখনোই যেকোনো মূল্যে বা যেকোনো সময়সীমার মধ্যে চুক্তি করা নয়।’

তিনি বলেন, ‘আলোচনার সময় আমরা বুঝতে পেরেছি, আমেরিকানরা অন্যায্য শর্তের মাধ্যমে আমাদের প্রধান শিল্পÑগাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম খাত ধ্বংস করতে চেয়েছিল। এটিই আমরা চুক্তিতে রাজি না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।’

কার্নি জোর দিয়ে বলেন, দেশে উৎপাদন বাড়ানো এবং বিদেশে বাণিজ্যের ক্ষেত্র বৈচিত্র্যময় করা শুরু থেকেই ‘প্রথম পরিকল্পনা’ ছিল।

সপ্তাহান্তে কার্নি আরও জানান, আলোচনার একেবারে শেষ পর্যায়ে মার্কিন আলোচকেরা অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য চুক্তির ওপরও বিধিনিষেধ আরোপের দাবি করেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘মার্কিন আলোচকেরা কানাডার ফরাসিভাষী প্রদেশ কুইবেকের ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়েও অগ্রহণযোগ্য ‘হুমকি’ দিয়েছিলেন।’

তবে সোমবার এক পৃথক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার একদম শেষ মুহূর্তে কানাডা অযৌক্তিক কিছু দাবি তুলেছিল, যার ফলে চুক্তিটি ভেস্তে যায়।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে যায়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার কানাডা; প্রথম অবস্থানে রয়েছে মেক্সিকো।

রোববার প্রকাশিত অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউটের জরিপে দেখা গেছে, প্রতি চারজন কানাডীয়র মধ্যে তিনজন বাণিজ্য আলোচনা থেকে সরে আসার কার্নি সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে দু’জন নিজেদের চাকরি নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন।

অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড গাড়ির ওপর ট্রাম্পের শুল্কের হুমকির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় ট্রাম্পকে জবাব দিয়েছেন।

ফোর্ড সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এর আগে বাণিজ্য বিরোধের এক পর্যায়ে অন্টারিও তিনটি মার্কিন অঙ্গরাজ্যে বিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছিল।

এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফোর্ডের সমালোচনা করেন এবং ‘আরও ভয়াবহ’ পরিণতির হুঁশিয়ারি দেন।

হোয়াইট হাউসের অভিযোগ, ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালকোহল, গাড়ি ও দুগ্ধজাত পণ্যের সঙ্গে ‘বৈষম্যমূলক আচরণ’ করেছে।

ট্রাম্প গত সপ্তাহে এসব শুল্ক কার্যকরের সময় তিন দিন পিছিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনা চলার পরও দুই পক্ষ কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।

সর্বশেষ শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা কানাডীয় পণ্যের প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশের ওপর কার্যকর হয়েছে। এসব পণ্যের মোট মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার। এর মধ্যে হকি স্টিক ও সিমেন্টের মতো পণ্যও রয়েছে।

সোমবার ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ‘কানাডা বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কানাডাকে প্রয়োজন নেই, কানাডারই আমাদের প্রয়োজন।’

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার শনিবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান, ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার নরম কাঠের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক তুলে নেওয়ার এবং গাড়ির ওপর বর্তমান ২৫ শতাংশ শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিল।

গ্রিয়ার বলেন, ওয়াশিংটন বেশিরভাগ কানাডিয়ান ইস্পাতের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করতেও প্রস্তুত ছিল।

শুল্ক নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ইউএসএমসিএ) সংশোধনের বিষয়েও সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। ট্রাম্প চুক্তিটি বর্তমান কাঠামোতে নবায়ন করতে রাজি নন।

এ ছাড়া কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার হুমকি দিয়ে এবং কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে ‘গভর্নর’ বলে সম্বোধন করে ট্রাম্প বারবার কানাডীয়দের ক্ষুব্ধ করেছেন। ট্রাম্প এমনভাবে উল্লেখ করেছেন, যেন তাঁরা অন্য একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী নন, বরং যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যের রাজনৈতিক নেতা।

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More