আকাশ জয়ের নতুন গল্প—ইউএস-বাংলার দিগন্ত ছোঁয়ার প্রস্তুতি

মো. কামরুল ইসলাম

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

২০২৭ সালের মধ্যে ২১টি নতুন বোয়িং, ২০ দেশে ৩০ আন্তর্জাতিক গন্তব্য এবং পূর্ণাঙ্গ বিমান পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য

বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতে এক যুগের পথচলায় ইউএসবাংলা এয়ারলাইন্স এখন প্রবেশ করতে যাচ্ছে আরও বড় পরিসরের সম্প্রসারণের অধ্যায়ে। শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ানো কিংবা নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার মধ্যেই নিজেদের ভবিষ্যৎকে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না প্রতিষ্ঠানটি। বরং একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত বিমান পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলে বাংলাদেশের আকাশপথকে বিশ্বের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে ইউএসবাংলা।

প্রতিষ্ঠানটির আগামী দিনের পরিকল্পনার অন্যতম বড় দিক হলো ২০২৭ সালের মধ্যে বহরে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করা। পরিকল্পনায় রয়েছে বোয়িং ৭৩৭৮ এবং বোয়িং ৭৩৭৮০০ ধরনের আধুনিক ন্যারোবডির উড়োজাহাজ। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে বহরের সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোতে ফ্লাইটের সংখ্যা।

একই সঙ্গে ২০২৭ সালের মধ্যে ২০টি দেশে ৩০টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে নিজেদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে ধাপে ধাপে এই নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও উত্তর আমেরিকার মতো দূরপাল্লার বাজারেও প্রবেশের সম্ভাবনা বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

২১ নতুন বোয়িং: শুধু বহর নয়, সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা

বিমান পরিবহন ব্যবসায় নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়া মানে কেবল বহরের আকার বৃদ্ধি নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নতুন রুট, বাড়তি আসন সক্ষমতা, ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সংশ্লিষ্ট বহু খাতের ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ।

ইউএসবাংলার পরিকল্পিত ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ। আধুনিক ন্যারোবডির উড়োজাহাজ ব্যবহারের মাধ্যমে স্বল্প ও মধ্যপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে আরও কার্যকরভাবে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে। নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজের জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং পরিচালন দক্ষতা দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় ব্যবস্থাপনায়ও সুবিধা দিতে পারে।

তবে নতুন উড়োজাহাজের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার, উপযুক্ত রুট নির্বাচন, বিমানবন্দরের উড্ডয়নঅবতরণ সময়সূচি, যাত্রী চাহিদা এবং পরিচালন দক্ষতার ওপর। ফলে নতুন বিমানকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত রুট ও পরিচালনা কৌশল বাস্তবায়নই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

২০ দেশে ৩০ আন্তর্জাতিক গন্তব্যের লক্ষ্য

আন্তর্জাতিক গন্তব্য সম্প্রসারণে ইউএসবাংলার কৌশল মূলত চাহিদাভিত্তিক। বাংলাদেশের প্রবাসী জনগোষ্ঠীর ভ্রমণ চাহিদা, ব্যবসায়িক যোগাযোগ, পর্যটন, ধর্মীয় ভ্রমণ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সম্ভাবনা—সবকিছু বিবেচনা করেই নতুন গন্তব্য নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বেঙ্গালুরুর মতো প্রযুক্তি ও ব্যবসাকেন্দ্রিক শহর, কলম্বোর মতো পর্যটন ও আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য, কাঠমান্ডুর মতো পর্যটন ও ধর্মীয় ভ্রমণের কেন্দ্র এবং পেনাংয়ের মতো পর্যটন, ব্যবসা ও প্রবাসী যাত্রীনির্ভর বাজার—প্রতিটির সম্ভাবনা আলাদা।

অন্যদিকে কুয়েত, দাম্মাম ও মদিনার মতো মধ্যপ্রাচ্যের গন্তব্যগুলো বাংলাদেশের বিপুল প্রবাসী জনগোষ্ঠী এবং ধর্মীয় পর্যটকদের কারণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

তবে নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তি, যাত্রী পরিবহনের অধিকার, বিমানবন্দরের উড্ডয়নঅবতরণ সময়সূচি, ভূমিসেবা, উড়োজাহাজের প্রাপ্যতা, জ্বালানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং রুটের আর্থিক সম্ভাব্যতা—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।

বিদেশি এয়ারলাইনের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন বাজারের একটি বড় অংশ বর্তমানে বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর দখলে। ফলে আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপুল অর্থনৈতিক মূল্য দেশের বাইরে চলে যায়।

একটি শক্তিশালী বাংলাদেশি বিমান পরিবহন সংস্থা এই অর্থপ্রবাহের একটি অংশ দেশের অর্থনীতির মধ্যে ধরে রাখতে পারে। তবে তার জন্য শুধু দেশীয় পরিচয় যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া, সময়নিষ্ঠতা, আধুনিক উড়োজাহাজ, বিস্তৃত গন্তব্য নেটওয়ার্ক এবং উন্নত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

ইউএসবাংলার সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য তাই বাংলাদেশের যাত্রীদের জন্য একটি শক্তিশালী দেশীয় বিকল্প তৈরি করা—যাতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে একজন বাংলাদেশি যাত্রী নিজের দেশের বিমান সংস্থাকে বেছে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

শুধু এয়ারলাইন নয়, পূর্ণাঙ্গ বিমান পরিবহন ব্যবস্থা

ইউএসবাংলার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত বিমান পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

একটি আধুনিক বিমান সংস্থা পরিচালনার সঙ্গে শুধু উড়োজাহাজ যুক্ত থাকে না। এর সঙ্গে প্রয়োজন বৈমানিক, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণ বিশেষজ্ঞ, ভূমিসেবা কর্মী, বিমান পরিবহন ব্যবস্থাপক, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, কার্গো ব্যবস্থাপনা কর্মী এবং বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনবল।

এই বাস্তবতায় ইউএসবাংলা ভবিষ্যতে বিমান পরিবহন প্রশিক্ষণ, বৈমানিক ও কেবিন ক্রু উন্নয়ন, প্রকৌশল ও রক্ষণাবেক্ষণ, ভূমিসেবা, কার্গো, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য বিমান পরিবহনসংশ্লিষ্ট সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

অর্থাৎ লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা, যেখানে বিমান সংস্থার পাশাপাশি বিমান পরিবহন শিল্পের বিভিন্ন সহায়ক খাতও একই ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠবে।

সম্প্রসারণের অন্যতম ভিত্তি হবে দক্ষ মানবসম্পদ

২১টি নতুন উড়োজাহাজ এবং বিস্তৃত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য বিপুল দক্ষ মানবসম্পদের প্রয়োজন হবে। বিমান পরিবহন শিল্পে উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি করাও একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।

বৈমানিক, প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু, ভূমিসেবা কর্মী এবং বিমান পরিবহন

বৈমানিক, প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু, ভূমিসেবা কর্মী এবং বিমান পরিবহন ব্যবস্থাপনা পেশাজীবীদের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে বিমান পরিবহন প্রশিক্ষণ অবকাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি হয়ে পড়বে।

ইউএসবাংলার দৃষ্টিতে তাই সম্প্রসারণের সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদানের সুযোগ বাড়ানো গেলে শুধু একটি বিমান সংস্থা নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক বিমান পরিবহন খাতও উপকৃত হবে।

কার্গো ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী অর্থনীতি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য এবং দ্রুত বাড়তে থাকা অনলাইন বাণিজ্য বিমান কার্গোর জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

তবে কার্গো পরিবহনের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু বিমান সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। দ্রুত কার্গো ব্যবস্থাপনা, শীতল সংরক্ষণ সুবিধা, দক্ষ কাস্টমস ছাড়পত্র, কার্গো টার্মিনাল, পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং বিমানবন্দরভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থা—সবকিছুর সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন।

ইউএসবাংলা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে কার্গো ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনাকে বিবেচনা করছে। যাত্রী পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে কার্গো পরিবহনকে সমন্বয় করতে পারলে নতুন আয়ের ক্ষেত্র তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যও আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।

ঢাকাকেন্দ্রিকতার বাইরে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ এখনো অনেকাংশে ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যাত্রীদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য অনেক সময় ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরতে হয়।

চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে সরাসরি আরও আন্তর্জাতিক গন্তব্য চালু করা গেলে যাত্রীদের সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি আঞ্চলিক পর্যটন, ব্যবসায়িক ভ্রমণ এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দরগুলোতে অভিবাসন, শুল্ক, ভূমিসেবা, উড্ডয়নঅবতরণ সময়সূচি এবং অন্যান্য পরিচালন সুবিধা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

পূর্ণসেবা ও স্বল্পমূল্যের বিমান পরিবহনের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের বিমান পরিবহন বাজারে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের যাত্রীর চাহিদা রয়েছে। কেউ উন্নত যাত্রীসেবা, লাগেজ সুবিধা ও উড়োজাহাজে অতিরিক্ত সেবা চান; আবার অনেক যাত্রীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাশ্রয়ী ভাড়া।

এই দুই ধরনের বাজারকে বিবেচনায় নিয়ে ইউএসবাংলা গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় পূর্ণসেবা বিমান সংস্থার পাশাপাশি স্বল্পমূল্যের বিমান পরিবহন ব্যবস্থার ধারণাও রয়েছে।

দুটি ব্যবসায়িক মডেলের অবস্থান ও পরিচালন কাঠামো আলাদা রেখে বাজারকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা গেলে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের বিমান ভ্রমণের বাজার আরও সম্প্রসারিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নিরাপত্তাই থাকবে মূল ভিত্তি

বহর যত বড় হবে, পরিচালন ব্যবস্থার জটিলতাও তত বাড়বে। তাই উড়োজাহাজ সম্প্রসারণের সঙ্গে নিরাপত্তা সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করা অপরিহার্য।

উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ, বৈমানিক প্রশিক্ষণ, কেবিন ক্রু প্রশিক্ষণ, প্রকৌশল মান, পরিচালন পদ্ধতি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধি অনুসরণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ বিমান পরিবহন খাতে নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি একটি বিমান সংস্থার অস্তিত্বের মৌলিক শর্ত।

প্রযুক্তি বদলে দেবে যাত্রীর অভিজ্ঞতা

ভবিষ্যতের বিমান পরিবহন শিল্প হবে আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। অনলাইনে টিকিট বুকিং, মোবাইলভিত্তিক গ্রাহকসেবা, স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধন, উড্ডয়নের তাৎক্ষণিক তথ্য, ডিজিটাল অর্থ পরিশোধ এবং যাত্রীভিত্তিক সেবা ক্রমেই যাত্রী অভিজ্ঞতার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠছে।

নতুন উড়োজাহাজের আধুনিক সুবিধার পাশাপাশি পুরো ভ্রমণপ্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও নির্বিঘ্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

অর্থাৎ লক্ষ্য শুধু আকাশে উন্নত সেবা দেওয়া নয়; টিকিট বুকিং থেকে বিমানবন্দর এবং উড়োজাহাজ থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথকে প্রযুক্তিনির্ভর ও সহজ করা।

বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব

আকাশপথের যোগাযোগ ও পর্যটন একে অপরের পরিপূরক। নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু হলে শুধু বিদেশগামী যাত্রী বাড়ে না; বিদেশি পর্যটক, ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেট, চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলসহ বিভিন্ন পর্যটন সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সরাসরি আকাশ যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একটি বাংলাদেশি বিমান সংস্থার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক যত বিস্তৃত হবে, বাংলাদেশের পর্যটন গন্তব্যগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার সুযোগও তত বাড়বে।

দূরপাল্লার বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি

ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও উত্তর আমেরিকার মতো দূরপাল্লার বাজার বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। তবে এসব বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত উড়োজাহাজ, প্রশিক্ষিত ক্রু, রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের অধিকার, বিমানবন্দরের সময়সূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি যাত্রী চাহিদা।

বিশেষ করে বড় আকারের উড়োজাহাজ পরিচালনা একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যবসায়িক কাঠামো। ফলে স্বল্প ও মধ্যপাল্লার নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার পাশাপাশি দূরপাল্লার ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ধাপে ধাপে প্রস্তুতি নেওয়াই বাস্তবসম্মত পথ।

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতিমালা

বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর সম্প্রসারণ শুধু প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে না। বিমানবন্দর অবকাঠামো, বিমান জ্বালানির মূল্য, কর, বিমানবন্দর ব্যবহারের খরচ, উড্ডয়নঅবতরণ সময়সূচি, নিয়ন্ত্রক সমন্বয় এবং দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তি—সবকিছুর ওপর বিমান সংস্থার ব্যবসায়িক সাফল্য নির্ভরশীল।

বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি উড়োজাহাজ বিনিয়োগের জন্য নীতিমালার স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি উড়োজাহাজ বহু বছর ধরে পরিচালিত হয়। তাই বিনিয়োগকারীদের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবেশ প্রয়োজন।

বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান

বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সরকার, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা অপরিহার্য।

আকাশপথে বাংলাদেশের নতুন অর্থনীতির সম্ভাবনা

ইউএসবাংলার সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সম্প্রসারণ হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়বে না। নতুন উড়োজাহাজ, নতুন রুট, দক্ষ মানবসম্পদ, কার্গো, পর্যটন, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রযুক্তি—সব মিলিয়ে এর প্রভাব বাংলাদেশের বিমান পরিবহন অর্থনীতির বিস্তৃত পরিসরে পড়তে পারে।

একটি শক্তিশালী দেশীয় বিমান সংস্থা আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনের আয় থেকে একটি অংশ দেশে ধরে রাখতে পারে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, পর্যটন বাড়াতে পারে এবং দেশের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ শক্তিশালী করতে পারে।

সেই অর্থে ২১টি নতুন বোয়িং শুধু ইউএসবাংলার বহরে যুক্ত হতে যাওয়া ২১টি উড়োজাহাজ নয়; এগুলো বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতের সামনে নতুন সম্ভাবনার প্রতীকও হতে পারে।

ইউএসবাংলার আগামী দিনের দর্শন তাই শুধু ‘আরও বিমান, আরও রুট’ নয়। লক্ষ্য আরও বড়—একটি শক্তিশালী বাংলাদেশি বিমান পরিবহন ব্র্যান্ড তৈরি করা, যা দেশের যাত্রীকে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করবে এবং একই সঙ্গে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে আরও দৃশ্যমান করবে।

ইউএস বাংলার দিগন্ত ছোঁয়ার প্রস্তুতি’—এই যাত্রায় ইউএসবাংলার পরবর্তী অধ্যায়ের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু বহরের আকারের ওপর নয়; বরং নিরাপত্তা, সেবা, দক্ষতা, দক্ষ মানবসম্পদ, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক বিমান পরিবহন নীতির সমন্বিত সক্ষমতার ওপর।

লেখক

মো. কামরুল ইসলাম

মহাব্যবস্থাপকজনসংযোগ

ইউএসবাংলা এয়ারলাইন্স

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More