এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৮ জন রাষ্ট্রপতি, কে কতদিন দায়িত্বে ছিলেন?

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

স্বাধীন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১৮ জন ব্যক্তি ২২ মেয়াদে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন, যাদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ছাড়াও ছিলেন অস্থায়ী ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। কেউ ছিলেন কয়েক মাস, আবার কেউ টানা একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রপতি পদে থাকা ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনের সময়কাল তুলে ধরা হলো,

শেখ মুজিবুর রহমান

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গঠিত মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা চালু হলে তিনি আবার রাষ্ট্রপতি হন। ওই বছরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে ছিলেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম ও পঞ্চম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম

শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানে বন্দি থাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময় তার অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী

১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি লন্ডন থেকে দেশে ফিরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন।

মুহম্মদুল্লাহ

আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার মুহম্মদুল্লাহ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন। পরে ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি নিয়মিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন এবং ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

খন্দকার মোশতাক আহমদ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ।

তবে তার মেয়াদ ছিল খুবই স্বল্প। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে তিনি মোট ৮১ দিন রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম

খন্দকার মোশতাক আহমদের পর ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম।

প্রায় দেড় বছর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন।

জিয়াউর রহমান

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তৎকালীন সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

বিচারপতি আবদুস সাত্তার

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর ১৯৮১ সালের ৩০ মে উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

পরে একই বছরের ২০ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে নিয়মিত রাষ্ট্রপতি হন তিনি। তবে মাত্র কয়েক মাস পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।

তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত বেসামরিক রাষ্ট্রপতি, যিনি সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন।

বিচারপতি এ এফ এম আহসান উদ্দীন চৌধুরী

আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করার তিন দিন পর, ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসান উদ্দীন চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

তবে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ কার্যত সেনাপ্রধান এরশাদের হাতে থাকায় তার রাষ্ট্রপতির মেয়াদ দীর্ঘ হয়নি। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি আবারও রাষ্ট্রপতি হন। তবে দীর্ঘ গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।

বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ

এরশাদের পতনের পর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ।

তিনি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করেন। দায়িত্ব শেষে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়েন।

পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তিনি। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পদ ছাড়েন।

দুই দফায় দায়িত্ব পালন করায় সাহাবুদ্দিন আহমদকে রাষ্ট্রপতিদের তালিকায় ১২তম ও ১৪তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে গণ্য করা হয়।

আব্দুর রহমান বিশ্বাস

সাহাবুদ্দিন আহমদের পর ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। তিনি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করে ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেন।

এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী

২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।

তবে বিএনপির সঙ্গে মতবিরোধের জেরে মাত্র সাত মাসের মাথায় ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন।

মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার

বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ

২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ।

২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও নেন তিনি। পরে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও রাষ্ট্রপতি পদে বহাল ছিলেন। তিনি ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

মো. জিল্লুর রহমান

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা মো. জিল্লুর রহমান। ২০১৩ সালের ২০ মার্চ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন।

মো. আবদুল হামিদ

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন মো. আবদুল হামিদ।

জিল্লুর রহমান অসুস্থ থাকাকালে ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে ২০ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

মো. সাহাবুদ্দিন

মো. আবদুল হামিদের দুই মেয়াদ শেষে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সময়ও তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন। পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন।

এর মধ্য দিয়ে তার রাষ্ট্রপতি মেয়াদের অবসান ঘটে। এদিনই দেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেন।

সর্বশেষ বঙ্গভবনের বাসিন্দা হবেন মির্জা ফখরুল

মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

মির্জা ফখরুল দায়িত্ব নিলে তিনি হবেন স্বাধীন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি এবং রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব নেওয়া ১৯তম ব্যক্তি।

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More