জুলাইয়ের চেতনা, রাজনৈতিক অনৈক্য ও প্রবাসীদের দীর্ঘশ্বাস — এক প্রবাসীর খোলা চিঠি

Avatar photoদীপ্ত নিউজ ডেস্ক

ইতিহাসের পাতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট (৩৬ জুলাই) কেবল একটি তারিখ নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্রজনতার ঐতিহাসিক বিজয়ের এক চিরভাস্বর প্রতীক। জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান আমাদের নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল—যেখানে বৈষম্য ও স্বৈরাচারী মানসিকতা থাকবে না এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত হবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আন্দোলনের সেই রক্তস্নাত বিজয়ের পর যখন সবার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করার কথা, ঠিক তখনই আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ ও মতানৈক্য দেখতে পাচ্ছি।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে—যাঁরা জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার পক্ষে ছিলেন, আজ দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাবে বা কাদের অদৃশ্য ইশারায় তাঁরা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়াচ্ছেন? জুলাইয়ের শক্তির মূল ভিত্তিই ছিল ঐক্য। সেই ঐক্য আজ বিনষ্ট হলে কার লাভ? এই রাজনৈতিক অনৈক্য কেবল পতিত স্বৈরাচারী শক্তিকেই পুনর্বাসিত হতে বা দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ করে দেবে—যা কোনো সচেতন নাগরিকেরই কাম্য হতে পারে না।

আজ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনের দিকে তাকালে এক করুণ দৃশ্য ভেসে ওঠে। বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। স্বল্প আয়ের মানুষ পরিবার নিয়ে জীবন ধারণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। এর ওপর যোগ হয়েছে বিদ্যুতের ভৌতিক বিল ও বিদ্যুৎ খাতের অস্থিরতা, যা মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে।

অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়ম সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিষাদময় করে তুলছে। পতিত কোনো শক্তি যে দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করবে—তা খুবই স্বাভাবিক ও অনুমেয়। কিন্তু সেই সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া কিংবা নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ব্যস্ত থেকে মূল সংকটগুলোকে আড়াল করা কি দায়িত্বশীল রাজনীতির পরিচয় হতে পারে?

আমরা প্রবাসীরা দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে রেমিট্যান্স পাঠাই। আমাদের ঘাম ঝরানো ও কষ্টার্জিত অর্থ কেবল আমাদের পরিবারকেই বাঁচিয়ে রাখে না, বরং দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার মূল স্তম্ভ হিসেবেও কাজ করে। প্রবাসে শত কষ্ট সয়েও আমরা যখন দেশের এই বিশৃঙ্খলা, অনৈক্য আর সাধারণ মানুষের হাহাকার দেখি, তখন আমাদের বুক ফেটে যায়।

বর্তমান সংকটময় সময়ে দেশকে সুস্থ ও স্বাভাবিক ধারায় পরিচালনা করতে হলে সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য। কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে জাতীয় স্বার্থে সবাইকে এক টেবিলে বসতে হবে।

সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি প্রবাসীদের আকুল আবেদন:

. জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা: জুলাই আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল সর্বস্তরের মানুষের ঐক্য। দলমতনির্বিশেষে দেশের স্বার্থে এই ঐক্য ধরে রাখতে হবে।

. দ্রব্যমূল্য ও বিদ্যুৎ বিল নিয়ন্ত্রণ: সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে এবং বিদ্যুৎ বিলের অসঙ্গতি দূর করে জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে হবে।

. আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমন: সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মেগা প্রকল্পগুলোর দুর্নীতি বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে।

. দেশ গঠনে মনোযোগ: রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে দেশকে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হোক প্রধান লক্ষ্য।

জুলাইয়ের শহীদদের রক্ত এবং প্রবাসীদের ঘাম যেন বৃথা না যায়। একটি স্থিতিশীল, শান্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সরকার, রাজনৈতিক দলসহ সকল পক্ষের দায়িত্বশীলতা ও ইতিবাচক সমন্বয়ই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

মো. মশিয়ার রহমান মিন্টু

রোম, ইতালি

আরও পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More