জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। বিএনপির হাইকমান্ড ইতিমধ্যে নতুন নেতৃত্ব চূড়ান্ত করার কাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে যেকোনো সময় নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানিয়েছে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও ছাত্রদলের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র।
সূত্রগুলো বলছে, নতুন কমিটি গঠনে সাংগঠনিক দক্ষতা, আন্দোলন–সংগ্রামে ভূমিকা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ক্লিন ইমেজের নেতাদের গুরুত্বের সহিত ভাবছে দলের হাইকমান্ড। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সুপার ফাইভ পদে একাধিক নেতার নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চূড়ান্ত তালিকায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে সংগঠনের ভেতরে–বাইরে জোর আলোচনা চলছে। নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে ছাত্রদলকে আগামী রাজনৈতিক কর্মসূচি ও জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আরও সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।
রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাসির উদ্দীন নাসিরের নেতৃত্বাধীন ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ১ মার্চ। নতুন নেতৃত্বে আসতে ছাত্রদলের সম্ভাব্য নেতারা এখন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও লবিং–তদবিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ইতিমধ্যে সংগঠনের এই শীর্ষ দুই পদে ডজনখানেক নেতার নাম আলোচনায় এসেছে। নেতৃত্বের দৌড়ে থাকা পদপ্রত্যাশীরা ক্যাম্পাসে শোডাউন এবং দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।
শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় যারা
ছাত্রদলের শীর্ষ পদে আলোচনায় আছেন ক্লিন ইমেজ খ্যাত ছাত্রনেতা আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া। বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ–সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থনীতির ছাত্র আফসান এর আগে কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করলেও এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রকার অন্যায় ও অনিয়মের অভিযোগ নেই। বিতর্কিত যেকোনো কর্মকাণ্ড থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেন এই ছাত্রনেতা। আন্দোলন–সংগ্রামে ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ২০২২ সালের ২৪ মে ছাত্রলীগের হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি। মাথা ফেটে যাওয়ায় ১৭টি সেলাই লাগে এবং পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। ২০২৩ সালে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন প্রবেশমুখে বিএনপি ঘোষিত অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে গাবতলী থেকে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন। এ ছাড়া ২৮ অক্টোবর–পরবর্তী বিএনপি ঘোষিত হরতাল–অবরোধ কর্মসূচিতে ঢাকা মহানগর উত্তর ও পশ্চিমে তিনি ছাত্রদলের মূল সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে মহানগর উত্তর ছাত্রদল ও পশ্চিম ছাত্রদল অবরোধ কর্মসূচিগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া নেতাকর্মীদের নিয়ে শাহবাগ, বাংলামোটর, সায়েন্সল্যাব, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরে আন্দোলন সফল করতে নিরলসভাবে কাজ করে যান। ৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে তিনি রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন এবং তা শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
আমান উল্লাহ আমান, বর্তমানে ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক। সংগীত বিভাগের ছাত্র আমান এর আগে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ২৮ অক্টোবর–পরবর্তী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি দুই মাস কারাগারে ছিলেন। ৫ আগস্টের পর সংগঠনকে সুশৃঙ্খল করা এবং ইতিবাচক রাজনীতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন আমান। তবে নারীঘটিত বিষয়সহ একাধিকবার নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন আমান।
মমিনুল ইসলাম জিসান বর্তমানে ছাত্রদলের এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র জিসান এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন।
আন্দোলন–সংগ্রামে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি পরিচিত মুখ। আওয়ামী লীগ আমলে একাধিকবার মামলা ও হামলার শিকার হন এবং একাধিকবার কারাবরণ করেন।
২০২৩ সালে ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। জুলাই–আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এখনো পর্যন্ত কোনো বিতর্কে জড়াননি এই ছাত্রনেতা।
সালেহ মো. আদনান। তৃণমূল নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা আদনান বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগের কমিটিরও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বরগুনা জেলা ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পর ২০১০ সাল থেকে ঢাবি ছাত্রদলের সঙ্গে ঢাকার রাজনীতির যাত্রা শুরু আদনানের। বরগুনা সরকারি কলেজে থাকাকালে ১/১১–এর অবৈধ সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হল শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হন। ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত থাকার অপরাধে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেন। এ ঘটনায় হল থেকে বের করে দেয় ছাত্রলীগ।
এ বি এম ইজাজুল কবির রুয়েল, ছাত্রদলের সহ–সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দুইবারের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আটটি মামলার আসামি এবং তিনবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেছেন ইজাজুল কবির রুয়েল। তিনি রাজপথের সক্রিয়, ত্যাগী এবং নির্যাতিত ছাত্রনেতা হিসেবে বিভিন্ন মহলে পরিচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাইরের কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থীও আলোচনায় রয়েছেন। তাঁরা হলেন ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির সহ–সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমুল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এম. রাজীবুল ইসলাম তালুকদার বিন্দু।
ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, বর্তমান কমিটির সহ–সভাপতি। এর আগে তিনি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ১ নম্বর সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ–স্বাস্থ্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ফ্যাসিবাদের সময় তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয় এবং একবার গ্রেপ্তার হন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের আউয়াল বর্তমানে এফসিপিএস অধ্যয়নরত আছেন।
কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ৯টি মামলা রয়েছে এবং রিমান্ডে ভয়ংকর নির্যাতনের শিকার হন। এ ছাড়া দুটি মামলায় সাজাভোগ করেন। কয়েকটি মামলা এখনো বিচারাধীন রয়েছে। ২০১৫ সালে অবরোধের সময় একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে পুলিশ তাঁকে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় তিনি ১০ মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
এ ছাড়া সহ–সভাপতি মো. মনজুরুল আলম রিয়াদ, খোরশেদ আলম সোহেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খলিল, মোস্তাফিজুর রহমান ও ফারুক হোসেন আলোচনায় আছেন।